ভগবান শ্রীবিষ্ণু—যিনি স্বয়ং বৈকুণ্ঠের অধিপতি। তাঁর শ্রীচরণে দেবতারা আশ্রয় নেন, তাঁর কৃপা পাওয়ার জন্য অগণিত ভক্তরা যুগ যুগ ধরে প্রার্থনা করেন।
কিন্তু আপনি কি কখনও শুনেছেন, সেই ভগবানই একসময় একজন অসুর রাজার দরজায় দ্বাররক্ষী বা প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন? একজন অসুর রাজার জন্য কেন এমন করলেন স্বয়ং নারায়ণ? আর সেই ঘটনাই বা কীভাবে জড়িয়ে গেল আমাদের রাখি পূর্ণিমার সঙ্গে?
আজকের এই নিবন্ধে আমরা জানবো রাখি পূর্ণিমার পৌরাণিক কাহিনী, যেখানে লুকিয়ে রয়েছে একজন ভক্তের অহংকার, ভগবানের আশ্চর্য লীলা এবং একটি পবিত্র রাখির অটুট বন্ধন।
অসুররাজ মহাবলির অহংকার ও বামন অবতার
অসুররাজ মহাবলি ছিলেন পরম বৈষ্ণব প্রহ্লাদের পৌত্র। অসুরবংশে জন্ম হলেও তিনি ছিলেন ভগবান শ্রীবিষ্ণুর এক পরম ভক্ত। তিনি ছিলেন অসীম শক্তিশালী এবং তাঁর দানের খ্যাতি তিন লোকেই ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর দরবার থেকে কেউ কখনো খালি হাতে ফিরত না।
তবে ধীরে ধীরে তাঁর মনে এক সূক্ষ্ম অহংকারের জন্ম নেয়। মহাবলি ভাবতে শুরু করেন যে, তাঁর শক্তি এত বেশি যে দেবতারাও তাঁর সামনে টিকতে পারবেন না এবং স্বর্গও তাঁর অধিকার হওয়া উচিত। নিজের ক্ষমতা আরও বাড়ানোর জন্য তিনি এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন।
দেবতারা বিপদের আঁচ পেয়ে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। ভগবান সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি মহাবলিকে ধ্বংস করবেন না, বরং তাঁর অহংকার ভাঙবেন। তাই তিনি ‘বামন’ (ক্ষুদ্র ব্রাহ্মণ বালক) রূপে মর্ত্যে অবতীর্ণ হন।

তিন পা জমির প্রতিশ্রুতি ও ত্রিবিক্রম রূপ
একদিন মহাবলির যজ্ঞ চলাকালীন সেখানে উপস্থিত হন এক ছোট্ট ব্রাহ্মণ বালক বা বামন অবতার। মহাবলি তাঁকে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে কিছু চাইতে বলেন। বামনদেব হাসিমুখে মাত্র তিন পা জমি চাইলেন। মহাবলি এত সামান্য জিনিস চাওয়ায় অবাক হলেও তা দিতে রাজি হয়ে যান।
কিন্তু তাঁর গুরু শুক্রাচার্য বুঝতে পারেন যে এই বালক কোনো সাধারণ মানুষ নন, স্বয়ং ভগবান শ্রীবিষ্ণু। তিনি মহাবলিকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং প্রতিজ্ঞার জলপাত্রের মুখ আটকে দেন। ভগবান তখন একটি কুশের মাধ্যমে সেই বাধা দূর করেন।
এরপর মহাবলি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেন। ঠিক তখনই ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। ছোট্ট বামনদেব বিরাটাকার ‘ত্রিবিক্রম’ রূপ ধারণ করেন। প্রথম পা ফেলতেই তাঁর পদতলে চলে এল সমগ্র পৃথিবী। দ্বিতীয় পায়ে তিনি পরিমাপ করলেন সম্পূর্ণ স্বর্গলোক।
ভগবান যখন ভক্তের দ্বাররক্ষী
ভগবান তখন মহাবলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, তাঁর তৃতীয় পা তিনি কোথায় রাখবেন? মহাবলি তখন বুঝতে পারেন যে, ভগবান তাঁর রাজ্য নিতে আসেননি, তিনি এসেছেন তাঁর অহংকার ভাঙতে। মহাবলি মাথা নত করে তাঁর মাথার ওপর ভগবানের তৃতীয় পা রাখতে বলেন।
মহাবলির অহংকার চূর্ণ হয়, কিন্তু তাঁর ভক্তি হয়ে ওঠে আরও গভীর। ভগবান তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে সুতল লোকের অধিপতি হওয়ার বর দেন। তখন মহাবলি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেন যেন প্রভু সর্বদা তাঁর কাছেই থাকেন। ভক্তের এই অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে ভগবান শ্রীবিষ্ণু মহাবলির দ্বারে প্রহরী হয়ে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
মাতা লক্ষ্মীর রাখি বন্ধন ও নারায়ণকে উদ্ধার
এদিকে বৈকুণ্ঠে মাতা লক্ষ্মী নিজের স্বামীকে না দেখতে পেয়ে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। দেবর্ষি নারদের পরামর্শে তিনি শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এক সাধারণ নারীর বেশে মহাবলির কাছে যান।
মাতা লক্ষ্মী মহাবলিকে নিজের ভাই হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর হাতে একটি পবিত্র রাখি বেঁধে দেন। বোনকে দেওয়া উপহার হিসেবে মহাবলি তাঁকে যেকোনো কিছু চাইতে বলেন। তখন মাতা লক্ষ্মী নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করেন এবং নিজের স্বামী অর্থাৎ ভগবান শ্রীবিষ্ণুকে ফিরে চান।
মহাবলি সবকিছু বুঝতে পারেন। সুতরাং, একজন ভাই হিসেবে বোনকে দেওয়া কথা রাখতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে ভগবানকে বৈকুণ্ঠে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন।
উপসংহার: এই পবিত্র পৌরাণিক কাহিনীর মধ্যেই লুকিয়ে আছে রাখি পূর্ণিমার এক গভীর শিক্ষা। রাখি শুধু একটি সুতো নয়, এটি মূলত বিশ্বাসের এবং প্রতিশ্রুতির এক পবিত্র প্রতীক। মহাবলি একসময় নিজের শক্তি নিয়ে অহংকার করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি সবকিছু ছেড়ে ভক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করলেন, ভগবান তখন তাঁর কাছেই ধরা দিলেন। এই কাহিনী আমাদের শেখায় যে, ভগবানকে পাওয়ার জন্য বড়ো হওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ একটি সত্যিকারের ভক্তিপূর্ণ হৃদয় এবং একটি ছোট্ট রাখির সুতোও ভগবানকে বেঁধে রাখতে পারে।
রাখি পূর্ণিমার এই চমৎকার কাহিনীটি আপনাদের কেমন লাগলো? আপনাদের মতামত অবশ্যই কমেন্ট করে জানান এবং ভক্তিভরে লিখবেন ‘জয় শ্রীবিষ্ণু’।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ভগবান বিষ্ণু কেন বামন অবতার ধারণ করেছিলেন?
অসুররাজ মহাবলির অহংকার ভাঙতে এবং দেবতাদের স্বর্গরাজ্য সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে ভগবান শ্রীবিষ্ণু এক ছোট্ট ব্রাহ্মণ বালক বা ‘বামন অবতার’ ধারণ করেছিলেন।
২. মাতা লক্ষ্মী কেন মহাবলিকে রাখি পরিয়েছিলেন?
ভগবান শ্রীবিষ্ণু তাঁর ভক্ত মহাবলিকে দেওয়া কথা রাখতে পাতাললোকে তাঁর দ্বাররক্ষী হয়ে অবস্থান করছিলেন। ভগবানকে বৈকুণ্ঠে ফিরিয়ে আনার জন্যই মাতা লক্ষ্মী সাধারণ নারীর বেশে গিয়ে মহাবলিকে ভাই পাতিয়ে রাখি পরিয়েছিলেন।
৩. মহাবলি কে ছিলেন?
মহাবলি ছিলেন একজন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দানশীল অসুররাজ। তিনি ছিলেন ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পরম ভক্ত প্রহ্লাদের পৌত্র।









