ভাদ্র মাসের অমাবস্যা মানেই আকাশে চাঁদ নেই, চারদিকে যেন এক গভীর অন্ধকার। কিন্তু সনাতন হিন্দু শাক্তধর্মের পরম্পরায় এই অন্ধকারের রাতই হলো এক বিশেষ শক্তির রাত, যাকে আমরা কৌশিকী অমাবস্যা নামে জানি।
এই পবিত্র তিথির মাহাত্ম্য বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাচীন পৌরাণিক যুগে, যখন শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দুই প্রবল অসুর দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গের অধিকার দখল করেছিল। তাই আজকের এই নিবন্ধে আমরা জানবো কৌশিকী অমাবস্যার ইতিহাস, দেবী কৌশিকীর আবির্ভাব এবং তারাপীঠের মা তারার মহারাত্রির সম্পূর্ণ কাহিনী।
দেবী কৌশিকীর আবির্ভাবের পৌরাণিক কাহিনী
অসুরদের প্রবল অত্যাচারে দেবতারা স্বর্গচ্যুত হলেন। ইন্দ্র, সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি—প্রত্যেক দেবতার অধিকার ও শক্তি ছিনিয়ে নিয়েছিল শুম্ভ ও নিশুম্ভ। ফলে নিরুপায় ও অসহায় দেবতারা হিমালয়ের আশ্রয়ে গিয়ে পরম শক্তি দেবী পার্বতীর স্তব করতে লাগলেন। ঠিক সেই সময় সেখানে উপস্থিত হলেন মাতা পার্বতী। তিনি দেবতাদের জিজ্ঞাসা করলেন— “তোমরা কাকে স্তব করছ?”
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল এক অপূর্ব ঘটনা। দেবী পার্বতীর দেহকোষ থেকে এক অপরূপ, উজ্জ্বল ও মহাশক্তিশালী দেবীর আবির্ভাব হলো। মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত ‘দেবী মাহাত্ম্য’-এ এই অলৌকিক আবির্ভাবের কথাই বলা হয়েছে। মাতা পার্বতীর শরীরের কোষ থেকে আবির্ভূত হওয়ার কারণে সেই দেবী সমগ্র জগতে “কৌশিকী” নামে পরিচিত হলেন। আর দেবী কৌশিকীর আবির্ভাবের পর মাতা পার্বতীর রূপ কৃষ্ণবর্ণ হয়ে যায় এবং তিনি কালিকা নামে পরিচিত হন।

শুম্ভের প্রস্তাব ও দেবীর অটল প্রতিজ্ঞা
দেবী কৌশিকী ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। কিন্তু তাঁর সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল অসীম শক্তি। শুম্ভ ও নিশুম্ভের দুই সেনাপতি চণ্ড ও মুণ্ড প্রথম দেবীকে দেখতে পায়। তারা বিস্মিত হয়ে অসুররাজ শুম্ভকে গিয়ে বলে যে, হিমালয়ের পর্বতে এমন অপরূপ দেবী তারা আগে কখনও দেখেনি।
শুম্ভ তখন দেবীকে নিজের অধিকারভুক্ত করার জন্য এক দূত পাঠায়। দূত দেবীর কাছে এসে শুম্ভের শক্তি ও ঐশ্বর্যের কথা জানিয়ে তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়। তবে দেবী শান্তভাবে উত্তর দিলেন— “আমি একটি প্রতিজ্ঞা করেছি। যে আমাকে যুদ্ধে পরাজিত করতে পারবে, সেই হবে আমার স্বামী।”
চামুণ্ডা রূপ ও রক্তবীজ বধ
অসুররা দেবীর এই কথাকে অবজ্ঞা করল। সুতরাং শুরু হলো ভয়ংকর যুদ্ধ। দেবীর সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন দেবশক্তির বিভিন্ন রূপ— ব্রাহ্মাণী, মাহেশ্বরী, বৈষ্ণবী, কৌমারী, বারাহী, নৃসিংহী এবং ঐন্দ্রী।
অসুরসেনাপতি চণ্ড ও মুণ্ড দেবীর বিরুদ্ধে আক্রমণ করলে, দেবীর ক্রোধ থেকে এক ভয়ংকর কৃষ্ণবর্ণ শক্তির প্রকাশ ঘটল— তিনি হলেন দেবী কালী। তিনি চণ্ড ও মুণ্ডকে নিমিষেই বধ করলেন। তাই দেবী সেই রূপে ‘চামুণ্ডা’ নামে পরিচিত হলেন।
এরপর রক্তবীজের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলো। রক্তবীজের শরীর থেকে মাটিতে যত রক্ত পড়ে, তত নতুন রক্তবীজের জন্ম হতে থাকে। ফলস্বরূপ, দেবী কালী তাঁর সমস্ত রক্ত পান করতে লাগলেন, যাতে এক ফোঁটা রক্তও মাটিতে পড়তে না পারে। অবশেষে রক্তবীজও পরাজিত হলো।
শুম্ভ ও নিশুম্ভ বধ
যুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি। নিশুম্ভ দেবীর সঙ্গে ভয়ংকর যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে, দেবী কৌশিকী তাঁকেও পরাজিত করলেন। শেষে শুম্ভ নিজেই দেবীর সামনে এসে দাঁড়াল। শুম্ভ অহংকার করে বলল যে, দেবী অন্য শক্তিদের সাহায্যে যুদ্ধ করছেন।
তখন দেবী ঘোষণা করলেন— “আমি একাই এই জগতের শক্তি। এই সমস্ত শক্তি আমারই প্রকাশ।” এরপর সমস্ত দেবীশক্তি আবার দেবী কৌশিকীর মধ্যেই বিলীন হয়ে গেল। দীর্ঘ সংগ্রামের পর দেবী শুম্ভকেও বধ করলেন। অসুরদের অত্যাচার থেকে মুক্ত হলো ত্রিভুবন এবং ধর্ম পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলো।
তারাপীঠ ও সাধক বামাক্ষ্যাপার কাহিনী
কৌশিকী অমাবস্যার ইতিহাস শুধুমাত্র শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলার নিজস্ব শাক্ত পরম্পরায় ভাদ্র মাসের এই অমাবস্যার রাত বিশেষভাবে শক্তি-আরাধনার সঙ্গে যুক্ত। এই রাতকে অনেক পরম্পরায় “তারা রাত্রি” বলেও অভিহিত করা হয়।
বিশেষ করে বীরভূমের তারাপীঠে এই রাতের মাহাত্ম্য অত্যন্ত গভীর। তারাপীঠের প্রচলিত পরম্পরা অনুযায়ী, এই রাত সাধনা ও মা তারার আরাধনার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। লোকপ্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, মহাশ্মশানের শ্বেতশিমূল গাছের নিচে সাধনায় নিমগ্ন সাধক বামাক্ষ্যাপা এই বিশেষ তিথিতেই মা তারার কৃপা ও দর্শন লাভ করেছিলেন এবং সিদ্ধিলাভ করেছিলেন।
এই কারণেই কৌশিকী অমাবস্যা তারাপীঠের কাছে শুধু একটি সাধারণ অমাবস্যা নয়, এটি মা তারা এবং মাতৃশক্তির এক বিশেষ মহারাত্রি। (যদিও সাধক বামাক্ষ্যাপার এই কাহিনী মূল পুরাণের অংশ নয়, এটি তারাপীঠের নিজস্ব সাধনা-পরম্পরা)।
উপসংহার: কৌশিকী অমাবস্যার এই অন্ধকার রাতের প্রকৃত শিক্ষা হলো— অন্ধকার যত গভীরই হোক না কেন, তার মধ্য থেকেই জাগ্রত হতে পারে শক্তির আলো। যে শক্তি অন্যায়কে বিনাশ করে, ভক্তকে আশ্রয় দেয় এবং অহংকারকে ধ্বংস করে ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করে। তাই মাতৃশক্তির আরাধনায় ভাদ্র অমাবস্যার এই রাত বাংলার শাক্তভক্তদের কাছে আজও অত্যন্ত পবিত্র।
এই পৌরাণিক কাহিনীটি আপনাদের কেমন লাগলো, তা অবশ্যই কমেন্ট করে জানান। ভক্তিভরে কমেন্টে লিখুন ‘জয় মা কৌশিকী’ এবং ‘জয় মা তারা’।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. কৌশিকী অমাবস্যা কী?
ভাদ্র মাসের অমাবস্যা তিথিকে সনাতন হিন্দু শাক্তধর্মে কৌশিকী অমাবস্যা বলা হয়। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পুণ্য তিথিতেই মাতা পার্বতীর কোষ থেকে দেবী কৌশিকীর আবির্ভাব হয়েছিল।
২. দেবী কৌশিকী কে ছিলেন?
দেবী কৌশিকী হলেন মাতা পার্বতীর এক অপরূপ সুন্দরী ও মহাশক্তিশালী রূপ। শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক অসুরদের বধ করার জন্য মাতা পার্বতীর দেহকোষ থেকে তাঁর সৃষ্টি হয়েছিল।
৩. কৌশিকী অমাবস্যাকে ‘তারা রাত্রি’ বলা হয় কেন?
বাংলার সাধক বামাক্ষ্যাপা এই বিশেষ তিথিতে তারাপীঠের মহাশ্মশানে মা তারার দর্শন ও সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তাই তারাপীঠে এটি ‘তারা রাত্রি’ বা মা তারার মহারাত্রি হিসেবে অত্যন্ত ভক্তিভরে পালিত হয়।









