হিন্দু ধর্মে পালিত ২৪টি একাদশীর মধ্যে হরিশয়নী একাদশী অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক পবিত্র একটি তিথি। এই একাদশীকে দেবশয়নী একাদশী, আষাঢ়ী একাদশী অথবা পদ্মা একাদশী নামেও ডাকা হয়। শাস্ত্র অনুযায়ী, এই দিন থেকেই ভগবান শ্রীবিষ্ণু ক্ষীরসাগরে অনন্তনাগের শয্যায় যোগনিদ্রায় গমন করেন। সেই কারণেই এই একাদশীকে ‘হরিশয়নী’ অর্থাৎ ‘হরির নিদ্রাগমনের দিন’ বলা হয়।
২০২৬ সালের হরিশয়নী একাদশী অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। কারণ এই দিন থেকেই শুরু হয় চার মাসব্যাপী চাতুর্মাস, যে সময় ভক্তরা বিশেষভাবে ভগবান বিষ্ণুর উপাসনা, জপ, তপস্যা, দান-পুণ্য এবং আত্মসংযমের মাধ্যমে ধর্মীয় জীবনকে আরও গভীরভাবে অনুসরণ করেন। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই একাদশীর ব্রত যথাযথভাবে পালন করলে বহু জন্মের পাপক্ষয় হয় এবং ভগবান শ্রীহরির বিশেষ আশীর্বাদ লাভ করা যায়।

হরিশয়নী একাদশী কী?
আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে পালিত হয় হরিশয়নী একাদশী। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, এই দিন ভগবান শ্রীবিষ্ণু ক্ষীরসাগরে যোগনিদ্রায় প্রবেশ করেন এবং পরবর্তী চার মাস, অর্থাৎ চাতুর্মাস পর্যন্ত সেই যোগনিদ্রায় অবস্থান করেন। এই সময়ে দেবতাদের বহু শুভ কার্য স্থগিত থাকে এবং মানবসমাজেও বিবাহ, গৃহপ্রবেশ, উপনয়ন প্রভৃতি অনেক মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান না করার প্রথা প্রচলিত রয়েছে।
চার মাস পর কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের প্রবোধিনী একাদশীতে ভগবান শ্রীহরির জাগরণ ঘটে। তাই হরিশয়নী একাদশী এবং প্রবোধিনী একাদশী—এই দুটি তিথি বৈষ্ণবদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
হরিশয়নী একাদশীর পৌরাণিক কাহিনি
পদ্মপুরাণ, ভবিষ্যোত্তর পুরাণ এবং স্কন্দপুরাণে হরিশয়নী একাদশীর মাহাত্ম্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বিশ্বজগতের কল্যাণের জন্য ভগবান শ্রীবিষ্ণু প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে যোগনিদ্রায় প্রবেশ করেন। এটি সাধারণ নিদ্রা নয়, বরং সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষার জন্য এক ঐশ্বরিক যোগাবস্থা।
এই সময়ে ভক্তদের জন্য আত্মসংযম, ভক্তি, জপ, দান এবং ধর্মচর্চার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই হরিশয়নী একাদশীকে শুধুমাত্র একটি ব্রত হিসেবে নয়, বরং আধ্যাত্মিক জীবনের নতুন সূচনা হিসেবেও দেখা হয়।

চাতুর্মাস কী? কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরিশয়নী একাদশী থেকেই শুরু হয় চাতুর্মাস। ‘চাতুর্মাস’ শব্দের অর্থ চার মাস। আষাঢ়ের শুক্ল একাদশী থেকে কার্তিকের শুক্ল একাদশী পর্যন্ত এই সময়কালকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়।
এই চার মাসে বহু সাধু-সন্ন্যাসী এক জায়গায় অবস্থান করে ধর্মপ্রচার, শাস্ত্রপাঠ, জপ ও তপস্যা করেন। গৃহস্থ ভক্তরাও এই সময়ে নিজের জীবনে সংযম আনার চেষ্টা করেন। অনেকেই পেঁয়াজ-রসুন, আমিষ খাদ্য, বিলাসিতা বা নির্দিষ্ট কিছু ভোগ্যবস্তু ত্যাগ করে ভগবান বিষ্ণুর আরাধনায় মনোনিবেশ করেন।
চাতুর্মাসকে আত্মশুদ্ধি, মানসিক সংযম এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির শ্রেষ্ঠ সময় বলে মনে করা হয়। তাই বহু ভক্ত এই সময়ে প্রতিদিন গীতা পাঠ, বিষ্ণু সহস্রনাম জপ, তুলসী পূজা এবং দান-পুণ্যের মতো সৎকর্ম পালন করে থাকেন।
হরিশয়নী একাদশীর ধর্মীয় গুরুত্ব
বৈষ্ণব ধর্মে এই একাদশীর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরাধনা করলে সংসারের দুঃখ-কষ্ট দূর হয় এবং জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে। শাস্ত্রে আরও বলা হয়েছে, আন্তরিক ভক্তিভরে একাদশী ব্রত পালন করলে বহু জন্মের পাপক্ষয় হয় এবং ভক্ত ভগবানের কৃপা লাভ করেন।
হরিশয়নী একাদশী আমাদের কেবল উপবাসের শিক্ষা দেয় না; এটি আমাদের আত্মসংযম, শুদ্ধ চিন্তা, ভক্তি, ক্ষমা, দানশীলতা এবং ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের বার্তাও প্রদান করে।
হরিশয়নী একাদশীর ব্রত পালনের নিয়ম
হরিশয়নী একাদশীর ব্রত পালনের মূল উদ্দেশ্য কেবল উপবাস নয়, বরং শরীর, মন ও আত্মাকে শুদ্ধ করা। শাস্ত্র অনুযায়ী, দশমী তিথির সন্ধ্যা থেকেই ব্রতের প্রস্তুতি শুরু করা উচিত। এই সময়ে সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ, সংযম পালন এবং ভগবান শ্রীবিষ্ণুর নামস্মরণ বিশেষভাবে শুভ বলে মনে করা হয়।
একাদশীর দিন ব্রহ্মমুহূর্তে উঠে স্নান সেরে পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করুন। এরপর পূজাস্থানে ভগবান বিষ্ণুর মূর্তি বা ছবি প্রতিষ্ঠা করে তুলসী পাতা, হলুদ ফুল, চন্দন, ধূপ, প্রদীপ, ফল ও পঞ্চামৃত নিবেদন করুন। আন্তরিক ভক্তিভরে ‘ওঁ নমো নারায়ণায়’ মন্ত্র জপ করুন এবং সম্ভব হলে বিষ্ণু সহস্রনাম, গীতা বা বিষ্ণু স্তোত্র পাঠ করুন।

উপবাস কীভাবে পালন করবেন?
সব ভক্তের শারীরিক সক্ষমতা একরকম নয়। তাই শাস্ত্রেও বিভিন্নভাবে একাদশী পালনের কথা বলা হয়েছে। কেউ নির্জলা উপবাস পালন করেন, কেউ শুধুমাত্র ফলাহার করেন, আবার কেউ দুধ, ফল বা সাত্ত্বিক নিরামিষ আহার গ্রহণ করেন। ভগবানের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান হল আন্তরিক ভক্তি ও নিষ্ঠা।
উপবাসের পাশাপাশি সারাদিন যতটা সম্ভব ঈশ্বরচিন্তা, জপ, কীর্তন ও ধর্মীয় আলোচনা করলে এই ব্রতের আধ্যাত্মিক ফল আরও বৃদ্ধি পায় বলে বিশ্বাস করা হয়।
এই দিনে কী দান করা শুভ?
হিন্দু ধর্মে দানকে অত্যন্ত মহৎ কর্ম বলা হয়েছে। হরিশয়নী একাদশীতেও দান-পুণ্যের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই দিনে সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র ও অভাবী মানুষকে খাদ্য, বস্ত্র, ফল, পানীয় জল, ছাতা, জুতো কিংবা ধর্মীয় গ্রন্থ দান করা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।
বিশেষ করে তুলসী চারা রোপণ বা দান এবং গরু, ব্রাহ্মণ বা অসহায় মানুষের সেবাকে বহু শাস্ত্রে পুণ্যদায়ক কর্ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরিশয়নী একাদশীতে কী করা উচিত নয়?
এই পবিত্র তিথিতে কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। যেমন—
- আমিষ আহার গ্রহণ করা।
- মদ্যপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার।
- পেঁয়াজ ও রসুনযুক্ত খাদ্য গ্রহণ।
- মিথ্যা কথা বলা বা অন্যের নিন্দা করা।
- রাগ, হিংসা ও অহংকারে লিপ্ত হওয়া।
- অকারণে সময় নষ্ট করা বা অশুভ কাজে অংশ নেওয়া।
পরিবর্তে সারাদিন ভগবানের নামস্মরণ, শাস্ত্রপাঠ এবং সৎকর্মে নিজেকে নিয়োজিত রাখাই এই ব্রতের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
পারণের নিয়ম
দ্বাদশী তিথিতে নির্দিষ্ট সময়ে ব্রত ভঙ্গ করাকেই পারণ বলা হয়। পারণের আগে ভগবান শ্রীবিষ্ণুকে প্রণাম করুন, তুলসী পাতা নিবেদন করুন এবং সম্ভব হলে দরিদ্র মানুষ বা ব্রাহ্মণকে অন্ন ও দক্ষিণা প্রদান করুন। এরপর সাত্ত্বিক খাদ্যের মাধ্যমে উপবাস ভঙ্গ করুন।

হরিশয়নী একাদশীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা
হরিশয়নী একাদশী আমাদের শেখায় যে প্রকৃত ধর্ম কেবল আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। আত্মসংযম, সত্যবাদিতা, করুণা, দানশীলতা, ভক্তি এবং ঈশ্বরের প্রতি পূর্ণ আস্থা—এই গুণগুলিই মানুষের জীবনকে সুন্দর করে তোলে। তাই এই একাদশী কেবল একটি উপবাসের দিন নয়, বরং নিজেকে পরিবর্তনের একটি পবিত্র সুযোগ।
উপসংহার: হরিশয়নী একাদশী শুধুমাত্র একটি উপবাসের দিন নয়; এটি ভক্তি, সংযম, আত্মশুদ্ধি এবং ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক। এই পবিত্র তিথি থেকেই শুরু হয় চার মাসব্যাপী চাতুর্মাস, যা একজন ভক্তের আধ্যাত্মিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। শাস্ত্র মতে, আন্তরিক নিষ্ঠা, সৎকর্ম, দান, জপ এবং শ্রীবিষ্ণুর আরাধনার মাধ্যমে এই ব্রত পালন করলে ভগবানের বিশেষ কৃপা লাভ করা যায় এবং জীবনে সুখ, শান্তি ও কল্যাণের পথ সুগম হয়।
আপনি কি প্রতি একাদশী ব্রত পালন করেন? হরিশয়নী একাদশী সম্পর্কে আপনার মতামত বা অভিজ্ঞতা অবশ্যই কমেন্টে জানাবেন এবং ভক্তিভরে লিখুন — “ওঁ নমো নারায়ণায়”।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. হরিশয়নী একাদশী কেন পালন করা হয়?
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে ভগবান শ্রীবিষ্ণু যোগনিদ্রায় প্রবেশ করেন। তাঁর কৃপা লাভ, আত্মশুদ্ধি, পাপক্ষয় এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির উদ্দেশ্যে এই ব্রত পালন করা হয়।
২. হরিশয়নী একাদশীকে দেবশয়নী একাদশী বলা হয় কেন?
‘দেবশয়নী’ শব্দের অর্থ দেবতার শয়ন বা নিদ্রা। এই দিন থেকেই ভগবান শ্রীবিষ্ণুর যোগনিদ্রা শুরু হয় বলে একে দেবশয়নী একাদশী বলা হয়।
৩. হরিশয়নী একাদশীর পর কোন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সময় শুরু হয়?
এই একাদশীর পরই শুরু হয় চার মাসব্যাপী চাতুর্মাস, যা ভক্তদের জন্য জপ, তপস্যা, শাস্ত্রপাঠ এবং সংযম পালনের বিশেষ সময়।
৪. এই দিনে তুলসী পাতা নিবেদন করা কি বাধ্যতামূলক?
ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পূজায় তুলসী পাতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই হরিশয়নী একাদশীতে তুলসী পাতা নিবেদন অত্যন্ত শুভ ও পুণ্যদায়ক বলে মনে করা হয়।
৫. অসুস্থ ব্যক্তি কি একাদশী ব্রত পালন করতে পারেন?
হ্যাঁ। তবে শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ফলাহার, দুধ বা সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করে ভক্তিভরে ব্রত পালন করা যায়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও উচিত।
৬. হরিশয়নী একাদশীর পর বিবাহ বা গৃহপ্রবেশ কেন করা হয় না?
প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান শ্রীবিষ্ণুর যোগনিদ্রাকালীন চাতুর্মাসে অনেক শুভ মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান স্থগিত রাখা হয়। তাই অধিকাংশ হিন্দু পরিবার এই সময়ে বিবাহ, গৃহপ্রবেশ বা উপনয়নের মতো অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলেন।
সম্পর্কিত আরও কিছু আধ্যাত্মিক পাঠ
- নির্জলা একাদশীর ব্রতকথা ও মাহাত্ম্য | কেন এটি ভীমসেনী একাদশী?
- অপরা একাদশীর ব্রতকথা ও মাহাত্ম্য
- কামদা একাদশীর ব্রতকথা, মাহাত্ম্য ও পালনের নিয়ম
- আমলকি একাদশী ব্রতকথা ও মাহাত্ম্য
- ভৈমী একাদশীর মাহাত্ম্য: জেনে নিন ব্রতকথা ও পালনের সঠিক নিয়ম
- গীতায় শ্রীকৃষ্ণ কর্মফল সম্পর্কে কী বলেছেন?
- শ্রী কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম (১০৮ নাম)
- ১০০+ শ্রীকৃষ্ণের উক্তি | ভগবদ্গীতার জীবন বদলে দেওয়া অমূল্য বাণী








