আমাদের স্বভাব হলো, কেউ যদি আমাদের নিন্দা করে বা কটুকথা বলে, আমরা খুব কষ্ট পাই। আমাদের মনে জ্বালা ধরে যায় এবং আমরা সেই ব্যক্তির প্রতি হিংসা বা রাগ পুষে রাখি । কিন্তু আপনি কি জানেন, সন্ত ও মহাপুরুষরা বলেন, যে আপনার নিন্দা করছে, সে আসলে আপনার ওপর বিশাল বড় কৃপা করছে? ।
শুনতে অবাক লাগলেও, আধ্যাত্মিক পথে এর গভীর অর্থ রয়েছে। আসুন জেনে নিই, কেন নিন্দুক আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু হতে পারে এবং কীভাবে এই পরিস্থিতি আমাদের ভক্তি পথে এগিয়ে দেয়।
১. নিন্দা: সাবান-জল ছাড়াই মন পরিষ্কার করার উপায়
আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের অনেক ভুল বা পাপ জমে থাকে, যা আমরা হয়তো জানিও না । যখন কেউ আমাদের নিন্দা করে, তখন সে আসলে আমাদের সেই পুরনো পাপ ও খারাপ সংস্কারগুলিকে বিনাশ করে দেয় ।
বিনা খরচে শুদ্ধি: সন্তরা বলেন, নিন্দুক আমাদের মনের ময়লা পরিষ্কার করে দেয়, কোনো সাবান বা জল ছাড়াই ।
ঈশ্বরের বিশেষ কৃপা: তাই কেউ নিন্দা করলে ভাববেন, ভগবান কৃপা করে এই নিন্দুকের মাধ্যমে আমার দোষগুলো ধুয়ে দিচ্ছেন এবং আমার প্রারব্ধ কাটিয়ে দিচ্ছেন ।
করণীয়: যদি নিন্দা সত্য হয়, তবে খুশি হয়ে দোষ শুধরে নিন। আর যদি মিথ্যা হয়, তবে বুঝবেন আপনার পাপ ক্ষয় হচ্ছে । মনে মনে তাকে ধন্যবাদ দিন ।
২. প্রশংসা হলো আধ্যাত্মিক পথের 'মিষ্টি বিষ'
আমরা প্রশংসা বা স্তুতি শুনতে খুব ভালোবাসি। কিন্তু সাধনার পথে প্রশংসা অত্যন্ত ক্ষতিকারক।
অহংকার বৃদ্ধি: প্রশংসা শুনলে আমাদের দেহাভিমান বা অহংকার বেড়ে যায়, যা ভজনের পথে বাধা সৃষ্টি করে ।
পুন্যের নাশ: কেউ প্রশংসা করলে এবং আমরা তাতে খুশি হলে, আমাদের সাধনার শক্তি বা পুণ্য নষ্ট হয়ে যায় ।
সঠিক মনোভাব: তাই কেউ প্রশংসা করলে মনে মনে লজ্জিত হওয়া উচিত এবং ভাবা উচিত, “আমি এই প্রশংসার যোগ্য নই, আমি অতি অধম” । প্রশংসা বাইরে দিয়ে শুনবেন, কিন্তু হৃদয়ে ঢুকতে দেবেন না ।
৩. বিপদ ও সম্পদের প্রকৃত সংজ্ঞা
হনুমান জীর মতে, জাগতিক কষ্ট বা অভাব আসল বিপদ নয়। যখন আমরা ভগবানকে ভুলে যাই, সেটাই হলো আসল বিপদ ।
নামের শক্তি: যদি আপনার হৃদয়ে হবিনাম বা ভগবানের স্মরণ থাকে, তবে বাইরের কোনো বিপদ—তা শারীরিক বা মানসিক যাই হোক—আপনার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না ।
সম্পদের ব্যবহার: সম্পদ পেলে অহংকার করবেন না। সেই সম্পদ গোপনে ভগবানের সেবা, সাধু সেবা এবং জীব সেবায় লাগান । এমনভাবে সেবা করুন যেন কেউ জানতে না পারে, তবেই তা ভক্তির সহায়ক হবে ।
৪. বইয়ের বোঝা বনাম রাধা নাম
অনেক সময় দেখা যায়, কেউ হয়তো অনেক বড় পন্ডিত, সমস্ত শাস্ত্র তার মুখস্থ, কিন্তু তার আচরণে ভক্তি নেই। মহাপুরুষরা বলেন, ভক্তিহীন পাণ্ডিত্য গাধার পিঠে বইয়ের বোঝার মতো ।
মর্খের জয়: অন্যদিকে, সমাজ যাকে ‘মূর্খ’ বলে, সে যদি নিজেকে দীনহীন মনে করে শুধু “রাধা রাধা” নাম জপ করে, তবে সে বড় বড় তপস্বীদের চেয়েও দ্রুত ঈশ্বরকে লাভ করতে পারে ।
আসল জ্ঞান: বেশি শাস্ত্র জ্ঞানের প্রয়োজন নেই, শুধু এইটুকু বুঝলেই হবে যে “আমি অধম এবং নামই আমার একমাত্র সম্বল” ।
৫. বৃন্দাবনের আশ্রয় ও সর্বস্ব ত্যাগ
আমাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত শ্রী রাধা-কৃষ্ণের চরণে আশ্রয় নেওয়া। বৃন্দাবনের মাটি (রজ) পরম পবিত্র এবং ক্ষমাশীল ।
বৃন্দাবনের প্রতিজ্ঞা: বৃন্দাবন ধাম কখনো তার আশ্রিতকে ত্যাগ করে না, এমনকি স্বপ্নের মধ্যেও না । শত অপরাধ হলেও ধাম আমাদের কোলে তুলে নেয় ।
সর্বম ত্যক্ত্বা (সব ছেড়ে): এর অর্থ হলো মন থেকে জাগতিক আসক্তি ত্যাগ করা । পরিবারে থেকেও মনে মনে সব আসক্তি ছেড়ে দিয়ে শুধু প্রিয়া-প্রিয়তমের (রাধা-কৃষ্ণ) প্রেম রস পান করাই জীবনের সার ।
উপসংহার
সুতরাং, আজ থেকে কেউ যদি আপনার নিন্দা করে, তার প্রতি রাগ করবেন না। মনে করবেন, ভগবান আপনার ভেতরটা পরিষ্কার করছেন। সব পরিস্থিতিতে—নিন্দা হোক বা স্তুতি, বিপদ হোক বা সম্পদ—ভগবানের নামই আমাদের একমাত্র আশ্রয় । আসুন, আমরা সকলে মিলে অহংকার ত্যাগ করে প্রেমভরে বলি— “রাধা রাধা”।
আপনার কি এই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন বা অভিজ্ঞতা আছে? নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানান।
FAQ's
১. কেউ নিন্দা করলে আমাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত? উত্তর: কেউ নিন্দা করলে রাগ না করে শান্ত থাকা উচিত। মনে করা উচিত যে, এর মাধ্যমে আমাদের পূর্বজন্মের বা এই জন্মের পাপ ক্ষয় হচ্ছে এবং ভগবান আমাদের দোষগুলো দেখিয়ে দিচ্ছেন ।
২. প্রশংসা শুনলে কেন সাধকের ক্ষতি হয়? উত্তর: প্রশংসা শুনলে মানুষের মনে সূক্ষ্ম অহংকার (দেহাভিমান) তৈরি হয় এবং ভজন বা সাধনার শক্তি (পুণ্য) কমে যায়। তাই সাধকদের জন্য প্রশংসা বিষের মতো ক্ষতিকর ।
৩. সম্পদ বা টাকা-পয়সা কি ভক্তির পথে বাধা সৃষ্টি করে? উত্তর: সম্পদ নিজে বাধা নয়, কিন্তু সম্পদের প্রতি আসক্তি বাধা সৃষ্টি করে। যদি সম্পদ গোপনে ভগবানের বা জীবের সেবায় নিষ্কামভাবে লাগানো হয়, তবে তা ভক্তির সহায়ক হয় ।
৪. ‘মূর্খ’ হয়েও কীভাবে ঈশ্বর লাভ সম্ভব? উত্তর: শাস্ত্রের জ্ঞান না থাকলেও, যদি কেউ নিজেকে দীনহীন মনে করে এবং পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে “রাধা রাধা” বা ভগবানের নাম জপ করে, তবে সে সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক গতি লাভ করতে পারে ।