
সনাতন ধর্মের সবচেয়ে আলোচিত শব্দ হলো ‘কর্ম’ (Karma)। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে ঐশ্বরিক জ্ঞান দিয়েছিলেন, তার অন্যতম মূল ভিত্তিই হলো এই কর্ম এবং ধর্ম। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে আমরা কি শ্রীকৃষ্ণের সেই আসল শিক্ষা ভুলে যাচ্ছি?
আজকাল অনেকেই কর্মফলের তত্ত্ব নিয়ে বিভ্রান্ত। কেউ কর্মের দোহাই দিয়ে অন্যায় সহ্য করে, আবার কেউ কর্মের নামে মানুষকে শোষণ করে। আসুন, গীতায় দেওয়া শ্রীকৃষ্ণের বাণীর আলোকে কর্মফলের আসল অর্থগুলো জেনে নিই।
“পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম।”
*অর্থাৎ, সাধুদের রক্ষা এবং দুর্জন বা দুষ্কৃতীদের বিনাশ করার জন্যই ভগবান যুগে যুগে অবতীর্ণ হন।*
১. কর্মফলের অজুহাত: কৌরবদের অন্যায় কি অর্জুন মুখ বুজে সহ্য করেছিলেন?
আমাদের সমাজে অনেক স্বার্থান্বেষী মানুষ কর্মের ধারণাকে বিকৃত করেছে। তারা দুর্বলকে শোষণ করার সময় বলে— “তুমি অত্যাচারিত হচ্ছ কারণ এটা তোমার গত জন্মের কর্মফল। তাই প্রতিবাদ না করে সব মুখ বুজে সহ্য করো।” এটি মানুষকে মানসিকভাবে দাস বানানোর একটি কৌশল মাত্র।
কুরুক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণ কিন্তু অর্জুনকে এই কথা বলেননি! কৌরবরা যখন পাণ্ডবদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নিয়েছিল এবং দ্রৌপদীর অপমান করেছিল, তখন শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেননি যে “এসব তোমাদের গত জন্মের কর্মফল, তাই মেনে নাও।” বরং তিনি বলেছিলেন, কাপুরুষের মতো বসে না থেকে অস্ত্র তোলো। অতীতের কর্ম যাই হোক না কেন, বর্তমানের ‘কর্ম’ দিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই হলো আসল ধর্ম।
২. সন্ত্রাসবাদ, ধর্ম এবং শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা
আপনি যদি সত্যিই শ্রীকৃষ্ণের দর্শন বোঝেন, তবে আপনি কখনোই একজন নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার করতে বা সন্ত্রাসবাদী হতে পারবেন না। সনাতন ধর্মে ‘কর্ম’-এর সাথে সবসময় ‘ধর্ম’ (Dharma)-কে যুক্ত করা হয়েছে। ধর্ম মানে ন্যায়ের পথ।
যখন কোথাও নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার হয়, তখন হিন্দু ধর্ম শুধু “কর্মফল সব বিচার করবে” বলে চুপ করে বসে থাকতে শেখায় না। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট বলেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই হলো আসল কর্মযোগ। যে ব্যক্তি নিরপরাধের ক্ষতি করে, সে চরম অধর্ম করছে এবং তাকে তার ভয়ানক কর্মফল ভোগ করতেই হবে।
৩. অবাধ্য মন (Mon) এবং শ্রীহরির প্রিয় ‘একাদশী’
কর্ম এবং ধর্মের তত্ত্ব বোঝা সহজ, কিন্তু বাস্তবে তা প্রয়োগ করা কঠিন। গীতায় অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলেছিলেন যে মানুষের মন বাতাসের চেয়েও চঞ্চল। যখন মানুষের মনে তীব্র রাগ, লোভ বা অহংকার জন্ম নেয়, তখন সে ভুলে যায় কোনটা ধর্ম আর কোনটা অধর্ম। শ্রীকৃষ্ণ উত্তরে বলেছিলেন, অভ্যাসের মাধ্যমেই এই অবাধ্য মনকে বশ করা সম্ভব।
এই মন নিয়ন্ত্রণের জন্যই হিন্দু ধর্মে শ্রীহরির অত্যন্ত প্রিয় একাদশী (Ekadashi) ব্রতের প্রচলন রয়েছে। একাদশী শুধু উপবাস বা না খেয়ে থাকার নাম নয়; এটি হলো মন এবং ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের একটি প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং। যখন আপনি নিজের ক্ষুধার মতো প্রবল শারীরিক ইচ্ছাকে নিজের ইচ্ছাশক্তিতে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখেন, তখন আপনি আপনার মনকেও বশ করার ক্ষমতা অর্জন করেন। আর যার নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আছে, সে কখনোই প্রলোভনে পড়ে খারাপ কর্ম করতে পারে না।
উপসংহার
শ্রীকৃষ্ণের শেখানো ‘কর্ম’ কোনো দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় ধারণা নয়। এটি অন্যায় সহ্য করার তত্ত্ব নয়। সঠিক কর্ম হলো ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা, একাদশীর মতো ব্রতের মাধ্যমে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। গীতায় ভগবান ঠিক এই শিক্ষাই আমাদের দিয়ে গেছেন।
সাধারণ জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১. গীতায় শ্রীকৃষ্ণ ‘নিষ্কাম কর্ম’ বলতে কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: নিষ্কাম কর্মের অর্থ হলো ফলাফলের প্রতি আসক্ত না হয়ে শুধুমাত্র নিজের কর্তব্য বা ধর্ম পালন করে যাওয়া। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, তোমার অধিকার শুধু কর্মে আছে, তার ফলে নয়।
২. গত জন্মের কর্মফল কি সত্যিই আমাদের বর্তমান জীবনকে প্রভাবিত করে?
উত্তর: সনাতন দর্শন অনুযায়ী, পূর্বের কর্ম আমাদের বর্তমান জীবনের কিছু পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে ঠিকই। কিন্তু গীতায় শ্রীকৃষ্ণ শিখিয়েছেন যে, আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (Free Will) আছে। বর্তমান জীবনের সঠিক ‘কর্ম’ পালনের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম।
৩. একাদশী পালন করলে মন কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়?
উত্তর: আমাদের মন মূলত পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা চালিত হয়। একাদশীর দিন সংযম পালন এবং আহার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আমরা সরাসরি আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে শাসন করতে শিখি। এই শারীরিক ও মানসিক শৃঙ্খলাই মনকে শান্ত করতে সাহায্য করে।
৪. কেউ যদি আমার সাথে অন্যায় করে, তবে কি আমি তার কর্মফলের জন্য অপেক্ষা করব?
উত্তর: শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা অনুযায়ী, প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে নয়, বরং ন্যায় ও ধর্ম রক্ষার স্বার্থে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা আপনার কর্তব্য। চুপ করে অন্যায় সহ্য করাও গীতায় অধর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় আপনার জীবন সর্বদা ন্যায়ের পথে চালিত হোক এবং আপনি সঠিক কর্ম করার শক্তি লাভ করুন। এই নিবন্ধটি আপনার কেমন লাগল তা অবশ্যই কমেন্ট করে জানান। ভক্তিভরে কমেন্ট বক্সে লিখুন ‘জয় শ্রীকৃষ্ণ’। ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।










