ভূমিকা বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর এই পার্বণের তালিকায় দেবী কালীর আরাধনা অন্যতম। কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যার ঘোর অন্ধকারের পর, পৌষ মাসের হাড়কাঁপানো শীতেও মা কালীর আরাধনা করা হয়। গ্রাম বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে দেবী ‘পৌষ কালী’ বা কোথাও কোথাও ‘মূলা কালী’ নামে পূজিতা হন। কিন্তু কেন এই অদ্ভুত নাম? এর পেছনে রয়েছে এক অলৌকিক ও ভক্তিময় কাহিনী। আজকের ব্লগে জানবো সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
পৌষ কালীর পৌরাণিক ও লৌকিক কথা
পৌষ কালী পুজোর সবথেকে প্রচলিত গল্পটি সাধক রামপ্রসাদ এবং গ্রাম বাংলার কৃষি সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে। লোককথা অনুযায়ী কাহিনীটি এইরকম:
একদা হাড়কাঁপানো পৌষ মাসে সাধক রামপ্রসাদ সেন মা কালীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। সেদিন ছিল অমাবস্যা তিথি। পুজোর আয়োজনে ব্যস্ত রামপ্রসাদ হঠাৎ খেয়াল করলেন, মাকে ভোগ নিবেদনের জন্য ফলমূল বা মিষ্টির অভাব রয়েছে। তীব্র শীতে এবং গভীর রাতে দোকানপাটও বন্ধ।
ব্যাকুল হৃদয়ে রামপ্রসাদ ভাবছিলেন, “খালি হাতে মাকে কী দেব?” ঠিক সেই সময় এক বৃদ্ধ কৃষক ক্ষেত থেকে সদ্য তোলা টাটকা সাদা মূলা বা মুলো নিয়ে যাচ্ছিলেন। রামপ্রসাদের চোখে পড়ল সেই শুভ্র মূলার দিকে। ভক্তিভরে তিনি ভাবলেন, মা তো ভক্তের ভাবটুকু নেন, বস্তুর বিচার করেন না। তাই তিনি সেই কৃষককে অনুরোধ করে কিছু মূলা চাইলেন এবং অত্যন্ত ভক্তি সহকারে সেই মূলা কেটে চিনি ও অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে মা কালীর চরণে নিবেদন করলেন।
কথিত আছে, মা কালী রামপ্রসাদের সেই ভক্তিতে এতটাই তুষ্ট হয়েছিলেন যে তিনি সেই মূলাই প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করেন। সেই থেকেই লোকমুখে এই কালীর নাম হয় ‘মূলা কালী’। হালিশহর এবং সংলগ্ন অঞ্চলে আজও পৌষ মাসে ধুমধাম করে এই কালীর পুজো হয় এবং দেবীকে মূলা ভোগ দেওয়া হয়।
পৌষ কালীর মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য
১. কৃষি ও প্রকৃতির যোগ: পৌষ মাস হলো নতুন ফসল ঘরে তোলার মাস। এই সময় গ্রাম বাংলায় নানা ধরণের সবজি ও পিঠে-পুলির আয়োজন হয়। পৌষ কালী পুজো আসলে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার। নতুন ওঠা ফসল ও সবজি মাকে নিবেদন করার মাধ্যমেই এই পুজো সম্পন্ন হয়।
২. শীতের সুরক্ষা: পৌষ মাসের তীব্র শীতে রোগবালাই বালাইয়ের প্রকোপ বাড়ে। বিশ্বাস করা হয়, পৌষ কালীর আরাধনা করলে শীতকালীন রোগ ও মহামারী থেকে গ্রাম ও পরিবার রক্ষা পায়। একে অনেকে ‘রক্ষা কালী’র রূপভেদও মনে করেন।
৩. পিঠে-পুলি ও ভোগ: এই পুজোর আরেকটি বিশেষত্ব হলো পিঠে ভোগ। পৌষ সংক্রান্তির আমেজ থাকায়, মাকে চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি নানা ধরণের পিঠে ও পায়েস নিবেদন করা হয়।
উপসংহার
পৌষ কালী পুজো আমাদের শেখায় যে আড়ম্বর নয়, ভক্তিই হলো পুজোর আসল উপকরণ। সাধক রামপ্রসাদ যেমন সামান্য মূলা দিয়ে মাকে তুষ্ট করেছিলেন, তেমনি আমরাও যদি শুদ্ধ চিত্তে মাকে ডাকি, তিনি আমাদের ডাকে সাড়া দেবেনই। পৌষের এই পবিত্র লগ্নে মা কালীর আশীর্বাদ সকলের ওপর বর্ষিত হোক।