
আপনি কি আপনার সন্তানের দীর্ঘায়ু এবং মঙ্গল কামনা নিয়ে চিন্তিত? বাংলার হাজার বছরের প্রাচীন সংস্কৃতিতে মায়েদের এক অটল বিশ্বাসের নাম হলো ‘নীল ষষ্ঠী’। চৈত্র মাসের শেষবেলায় যখন বসন্তের বিদায় এবং গ্রীষ্মের আগমনী বার্তা পাওয়া যায়, তখনই বাংলার ঘরে ঘরে মহাদেবের আরাধনায় মগ্ন হন মায়েরা। শাস্ত্রমতে, এই ব্রত পালন করলে সন্তানের ওপর আসা সমস্ত বিপদ কেটে যায় এবং পরিবারে সুখ-শান্তি বজায় থাকে।
আজকের এই নিবন্ধে আমরা 2026 সালের নীল ষষ্ঠীর সঠিক তারিখ, পুজো দেওয়ার নিয়ম এবং এর গভীর মাহাত্ম্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।
ইংরেজি তারিখ: 13 April, 2026 (সোমবার)
বাংলা তারিখ: 29 চৈত্র, 1432 বঙ্গাব্দ।
*দ্রষ্টব্য: চৈত্র সংক্রান্তির ঠিক আগের দিন এই ব্রত পালন করা হয়।*
নীল ষষ্ঠীর পৌরাণিক মাহাত্ম্য ও নীলকণ্ঠের কাহিনী
নীল পুজোর উৎপত্তির সাথে সমুদ্র মন্থনের এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, সমুদ্র মন্থনের সময় যখন ভয়ংকর ‘হলাহল’ বিষ উঠে এসেছিল, তখন সৃষ্টিকে রক্ষা করার জন্য ভগবান শিব সেই বিষ পান করেন। বিষের জ্বালায় তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে যায়, যার ফলে তিনি ‘নীলকণ্ঠ’ নামে পরিচিত হন।
বিষের প্রভাবে মহাদেব যখন সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন, তখন দেবী পার্বতী অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তিনি মহাদেবের আরোগ্য এবং জীবনের জন্য উপবাস ও প্রার্থনা করেছিলেন। পার্বতীর সেই কৃচ্ছ্রসাধন এবং ভালোবাসার স্মরণে আজও মায়েরা তাদের আপনজন ও সন্তানদের মঙ্গলের জন্য নীল ষষ্ঠী পালন করেন।
অন্য একটি লোককথা অনুযায়ী, এক নিঃসন্তান দম্পতি মা ষষ্ঠীর নির্দেশে এই দিনে শিব-দুর্গার আরাধনা করে পুত্রসন্তান লাভ করেছিলেন। এই কারণে বাংলার লোকসমাজে বিশ্বাস করা হয় যে, ভক্তিভরে নীল পুজো করলে নিঃসন্তানদের কোল পূর্ণ হয় এবং সন্তানদের আয়ু বৃদ্ধি পায়।
কীভাবে পালন করবেন নীল ষষ্ঠী? (সঠিক পূজা বিধি)
নীল ষষ্ঠীর ব্রত পালনের ক্ষেত্রে শুদ্ধাচার এবং ভক্তি অত্যন্ত জরুরি। নিচে সহজভাবে নিয়মগুলো দেওয়া হলো:
- উপবাস ও স্নান: এই দিনে ব্রতী মায়েরা সারাদিন নির্জলা উপবাস করেন। সকালে স্নান সেরে পরিষ্কার কাপড় পরে পুজোর প্রস্তুতি শুরু করতে হয়।
- শিব লিঙ্গে অভিষেক: নিকটস্থ শিব মন্দিরে গিয়ে মহাদেবের মাথায় গঙ্গাজল, দুধ, দই এবং মধু দিয়ে অভিষেক করতে হয়। মনে রাখবেন, মহাদেব সাদা এবং নীল ফুল খুব পছন্দ করেন।
- উপকরণ: পুজোয় বেলপাতা, ধুতুরা, আকন্দ ফুল এবং বিশেষ করে ‘নীল অপরাজিতা’ ফুল অর্পণ করা অত্যন্ত শুভ।
- নীল বাতি প্রজ্বলন: সন্ধ্যার সময় শিব মন্দিরে বা বাড়ির তুলসী তলায় ঘিয়ের প্রদীপ বা 'নীল বাতি' জ্বালানো হয়। এই প্রদীপটি জ্বালানোর সময় মনে মনে সন্তানের মঙ্গল কামনা করতে হয়।
- পারন বা উপবাস ভঙ্গ: সন্ধ্যার আরতি এবং নীল বাতি জ্বালানোর পর মহাদেবের চরণামৃত ও প্রসাদী ফল খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করতে হয়। সাধারণত এই দিনে বাড়িতে নিরামিষ আহার বা ফলার (সাবু মাখা, ফল) খাওয়ার চল রয়েছে।
বাংলার লোকসংস্কৃতি: গাজন ও নীল নাচ
নীল পুজো কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাংলার গ্রাম্য লোকসংস্কৃতির এক অনন্য উৎসব। চৈত্র মাসের এই সময়েই শুরু হয় গাজন উৎসব। নীল পুজোর দিনে সন্ন্যাসীরা শিব ও গৌরীর সাজে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ান। ঢাকের বাদ্যি আর ‘বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে...’ ধ্বনিতে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। সন্ন্যাসীরা নীল নাচ নেচে গৃহস্থের মঙ্গল প্রার্থনা করেন এবং বিনিময়ে তারা চাল বা অর্থ গ্রহণ করেন। এই প্রথা আজও বাংলার অনেক গ্রামে অমলিন হয়ে আছে।
সাধারণ জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১. নীল ষষ্ঠীতে কি অন্ন গ্রহণ করা যায়?
উত্তর: না, নীল ষষ্ঠীর দিন যারা ব্রত পালন করেন তারা সাধারণত অন্ন বা ভাত গ্রহণ করেন না। ফল, মিষ্টি বা নিরামিষ ফলার খেয়ে এই ব্রত সম্পন্ন করা হয়।
২. নীল বাতি কেন জ্বালানো হয়?
উত্তর: নীল বাতি জ্বালানো হয় মহাদেবের বিষের জ্বালা শান্ত করতে এবং জীবনের অন্ধকার কাটিয়ে মঙ্গলের আলো আনতে। এটি সন্তানের দীর্ঘায়ুর প্রতীক।
৩. নীল ষষ্ঠী কি কেবল মায়েদের জন্য?
উত্তর: শাস্ত্র মতে যে কেউ মহাদেবের আরাধনা করতে পারেন, তবে বাংলার লৌকিক প্রথা অনুযায়ী মায়েরা সন্তানদের সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গলের জন্য এই ব্রতটি বেশি পালন করে থাকেন।
মহাদেব ও মা ষষ্ঠীর কৃপায় আপনার সন্তান এবং পরিবার সর্বদা সুখে-শান্তিতে থাকুক। এই নিবন্ধটি আপনার কেমন লাগল তা অবশ্যই কমেন্ট করে জানান। ভক্তিভরে কমেন্ট বক্সে লিখুন 'জয় বাবা নীলকণ্ঠ'। ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।










