সনাতন ধর্মে একাদশী তিথি ভগবান বিষ্ণুর অত্যন্ত প্রিয়। মাঘ মাসের শুক্লপক্ষে পালিত একাদশীকে বলা হয় ‘ভৈমী একাদশী’। শাস্ত্র ও পুরাণ অনুসারে, এই একাদশী পালন করলে কেবল পাপমোচনই হয় না, বরং জাগতিক জীবনের বহু জটিল সমস্যা—বিশেষ করে ভূমি বা বাস্তু সংক্রান্ত দোষ এবং আর্থিক অনটন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
আজকের এই ব্লগে আমরা জানব ভৈমী একাদশীর বিশেষ মাহাত্ম্য, এর পেছনের পৌরাণিক কাহিনি এবং ব্রত পালনের সঠিক নিয়মাবলী।
ভৈমী একাদশীর বিশেষ মাহাত্ম্য
কেন এই একাদশী অন্যান্য একাদশীর চেয়ে আলাদা? শাস্ত্র মতে ভৈমী একাদশী পালনের বিশেষ কিছু সুফল রয়েছে যা গৃহস্থ মানুষের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর:
১. ভূমিদোষ ও বাস্তু দোষ খণ্ডন: নামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ‘ভূমি’ বা মাটির যোগ। যারা জমিজমা সংক্রান্ত আইনি ঝামেলায় আছেন বা গৃহে বাস্তু দোষ রয়েছে, তাদের জন্য এই ব্রত অব্যর্থ।
২. দারিদ্র্য ও ঋণ মুক্তি: সংসারে কঠোর পরিশ্রম করেও যারা ফল পান না বা ঋণের জালে জড়িয়ে আছেন, এই ব্রত তাদের জীবনে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনে।
৩. পাপ নাশ: কথিত আছে, এই একাদশী নিষ্ঠার সাথে পালন করলে পূর্বজন্মের পাপ এবং বংশগত দোষ নাশ হয়।
ভৈমী একাদশীর ব্রতকথা
ভৈমী একাদশীর মাহাত্ম্য বোঝাতে একটি অত্যন্ত প্রচলিত কাহিনি রয়েছে।
অনেক কাল আগে, এক গ্রামে এক অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তি বাস করতেন। মানুষটি ছিলেন সৎ ও কর্মঠ। দিনরাত পরিশ্রম করতেন, কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস—কোনো কাজেই তিনি সফলতা পেতেন না। জমিতে ফসল ফলালে তা অকারণে নষ্ট হয়ে যেত, দিন দিন ঋণের বোঝা বাড়ত এবং সংসারে অশান্তি লেগেই থাকত।
হতাশ হয়ে তিনি যখন দিশেহারা, তখন সেই গ্রামে এক সাধুর আগমন ঘটল। সেই ব্যক্তি সাধুর চরণে লুটিয়ে পড়ে নিজের দুঃখের কথা জানালেন। সাধু দিব্যচক্ষুতে সব বুঝতে পেরে বললেন—
“বৎস, তোমার এই দুর্দশার কারণ হলো ভূমিদোষ ও পূর্বকৃত কর্মফল। তুমি ভৈমী একাদশীর দিন নিষ্ঠাভরে উপবাস থেকে ভগবান বিষ্ণুর আরাধনা করো। এতে তোমার সকল সংকট দূর হবে।”
সাধুর কথামতো তিনি ভৈমী একাদশীর দিন কঠোর নিয়ম মেনে ব্রত পালন করলেন। সারাদিন উপবাস থেকে তিনি কায়মনবাক্যে শ্রীহরিকে ডাকলেন এবং রাতে একাদশীর ব্রতকথা শ্রবণ করলেন।
রাতে ঘুমানোর পর তিনি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন। দিব্য জ্যোতির মধ্যে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ধারী ভগবান বিষ্ণু আবির্ভূত হয়ে বললেন: “তোমার ভক্তিতে আমি প্রসন্ন হয়েছি। আজকের এই ব্রত পালনের ফলে তোমার দারিদ্র্য, ভূমিদোষ এবং বংশগত সমস্ত পাপ নাশ হলো।”
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর তিনি এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি অনুভব করলেন। এরপর থেকে তার জীবনে আমূল পরিবর্তন এল। বন্ধ্যা জমিতে সোনার ফসল ফলল, ঋণের বোঝা নেমে গেল এবং সংসারে ফিরে এল সুখ ও সমৃদ্ধি।
ব্রত পালনের সঠিক নিয়ম
ভৈমী একাদশীর পূর্ণ ফল লাভ করতে হলে শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে চলা বাঞ্ছনীয়। নিচে সহজভাবে পালনের নিয়মগুলো দেওয়া হলো:
১. ব্রহ্মমুহূর্তে জাগরণ ও স্নান: একাদশীর দিন সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করুন।
২. সংকল্প: মনে মনে সংকল্প করুন—”হে ভগবান, আজ আমি ভক্তিভরে তোমার উদ্দেশ্যে ভৈমী একাদশীর ব্রত পালন করব, তুমি আমাকে শক্তি দাও।”
৩. তুলসী সেবা: সকালে স্নানের পর তুলসী গাছে জল দান করুন এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রণাম করুন।
৪. পূজা ও উপবাস: সারাদিন সাধ্যমতো নির্জলা অথবা ফলমূল ও দুগ্ধজাত খাবার খেয়ে উপবাস করুন। ভগবান বিষ্ণুর চরণে পুষ্প ও তুলসী অর্পণ করুন।
৫. নাম জপ: সারাদিন কাজ-কর্মের মধ্যেই মনে মনে ‘ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়’ বা হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করুন। পরচর্চা বা মিথ্যা কথা থেকে বিরত থাকুন।
৬. কথা শ্রবণ: সন্ধ্যার পর ধূপ-দীপ জ্বালিয়ে ভৈমী একাদশীর ব্রতকথা পাঠ করুন বা শ্রবণ করুন। এটি ব্রতের একটি আবশ্যিক অঙ্গ।
৭. পারণ: পরদিন দ্বাদশী তিথির নির্দিষ্ট সময়ে ব্রাহ্মণ ভোজন করিয়ে বা সাধ্যমতো দান করে ব্রত ভঙ্গ (পারণ) করুন।
বিশ্বাস ও ভক্তিই হলো ঈশ্বরের কৃপা লাভের মূল চাবিকাঠি। আপনার জীবনে যদি জমি বা অর্থ সংক্রান্ত কোনো সমস্যা থাকে, তবে এবারের ভৈমী একাদশী অবশ্যই নিষ্ঠার সাথে পালন করুন। ভগবান শ্রীহরির কৃপায় আপনার জীবনও হয়ে উঠুক সুখময়।
জয় শ্রী কৃষ্ণ।