সনাতন ধর্মে একাদশী ব্রতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সারা বছর ধরে যে একাদশী পালিত হয়, তার মধ্যে ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীকে বলা হয় ‘আমলকী একাদশী’ (Amalaki Ekadashi)। sukherchabikathi.in-এর আজকের এই বিশেষ পর্বে আমরা জানব এই পরম পবিত্র আমলকী একাদশীর ব্রতকথা, মাহাত্ম্য এবং পূজা বিধি সম্পর্কে।
আমলকি একাদশী হিন্দু ধর্মের একটি অত্যন্ত পবিত্র একাদশী ব্রত। হিন্দু শাস্ত্র মতে এই দিনে ভগবান বিষ্ণুর পূজা করা হয় এবং আমলকি বা আমলকী গাছকে বিশেষভাবে পূজা করা হয়।
ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে, আমলকি একাদশীর দিনে উপবাস ও ভক্তিভাবে পূজা করলে জীবনের পাপ নাশ হয় এবং ভগবান বিষ্ণুর কৃপা লাভ হয়।
আমলকি একাদশী ব্রতকথা
প্রাচীনকালে বৈদিশা নামে এক অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী নগরী ছিল। সেই নগরীর রাজা ছিলেন চৈত্ররথ। তিনি অত্যন্ত প্রজাবৎসল এবং ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত ছিলেন। তাঁর রাজ্যের সকল প্রজা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে একাদশী ব্রত পালন করতেন।
একবার ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের আমলকী একাদশীর দিন রাজা, প্রজা এবং মুনি-ঋষিরা মিলে নদীর তীরে এক মন্দিরে আমলকী বৃক্ষের পূজা করছিলেন। তাঁরা সারারাত জেগে হরিনাম সংকীর্তন ও জাগরণ করছিলেন।
সেই সময় এক ক্ষুধার্ত ব্যাধ (শিকারী) সেই মন্দিরের কাছে এসে উপস্থিত হয়। সে জীবনে বহু পাপ কাজ করেছিল এবং জীবহত্যা করেই তার সংসার চলত। কিন্তু সেই রাতে মন্দিরে ভক্তদের ভক্তিপূর্ণ পূজা ও নাম-সংকীর্তন দেখে সে মুগ্ধ হয়ে যায়। ব্যাধ কিছু না খেয়েই সারারাত সেখানে বসে ভগবানের নাম শুনতে থাকে এবং অজ্ঞাতসারেই তার একাদশী ব্রত ও রাত্রি জাগরণ পালিত হয়ে যায়।
পরদিন সকালে সে নিজের বাড়ি ফিরে খাবার খায়। কিছুকাল পর সেই ব্যাধের মৃত্যু হয়। কিন্তু ওই আমলকী একাদশীর পুণ্যফলে সে পরবর্তী জন্মে রাজা বিদূরথ নামে এক মহান ও পরাক্রমশালী রাজা হিসেবে জন্মগ্রহণ করে।
একবার রাজা বিদূরথ জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন এবং একটি গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়েন। তখন কিছু দস্যু রাজাকে আক্রমণ করতে আসে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, দস্যুদের অস্ত্র রাজার শরীরে লাগার আগেই ফুল হয়ে ঝরে পড়তে থাকে। হঠাৎ রাজার শরীর থেকে এক দিব্য শক্তির প্রকাশ ঘটে এবং সেই শক্তি সমস্ত দস্যুদের নিধন করে।
রাজা ঘুম থেকে উঠে দেখেন সমস্ত দস্যু মারা গেছে। তিনি অবাক হয়ে ভাবেন, কে তাকে বাঁচাল! তখন আকাশবাণী হয়— “হে রাজন! তোমার পূর্বজন্মের আমলকী একাদশী ব্রতের পুণ্যফলেই স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু তোমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন।”
রাজা তখন ঈশ্বরের মহিমা বুঝতে পারেন এবং নিজের রাজ্যে ফিরে আজীবন নিষ্ঠার সঙ্গে একাদশী ব্রত পালন করে শেষে বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হন।
আমলকি একাদশী ব্রতের মাহাত্ম্য
হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী আমলকি একাদশীর মাহাত্ম্য অত্যন্ত মহান।
এই ব্রত পালনের ফলে —
জীবনের পাপ নাশ হয়
ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদ লাভ হয়
সংসারে সুখ ও শান্তি আসে
ভক্তের জীবনে সৌভাগ্য বৃদ্ধি পায়
জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ হয়
বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে আমলকি গাছের পূজা করলে ভগবান বিষ্ণু বিশেষভাবে প্রসন্ন হন।
আমলকি একাদশী ব্রত পালনের নিয়ম
এই পুণ্য তিথিতে ভগবান শ্রীহরি ও আমলকী গাছের পূজা করা অত্যন্ত শুভ।
স্নান ও সংকল্প: সকালে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করুন এবং ব্রতের সংকল্প নিন।
আমলকী বৃক্ষের পূজা: বাড়ির আশেপাশে আমলকী গাছ থাকলে তার গোড়ায় জল দিন। ধূপ, দীপ, ফুল ও চন্দন দিয়ে গাছের পূজা করুন।
বিষ্ণু পূজা: ভগবান বিষ্ণুর মূর্তিতে বা ছবিতে তুলসী পাতা ও আমলকী অর্পণ করুন।
কথা শ্রবণ: ভক্তিভরে আমলকী একাদশীর ব্রতকথা পড়ুন বা শুনুন।
জাগরণ ও দান: সম্ভব হলে রাতে জাগরণ করে হরিনাম করুন এবং পরদিন দ্বাদশীর সকালে ব্রাহ্মণ বা দরিদ্রদের অন্ন ও আমলকী দান করে ব্রত ভঙ্গ বা পারণ করুন।
আমলকি একাদশীতে কী খাওয়া যায়
অনেক ভক্ত নির্জলা উপবাস করেন। তবে কেউ কেউ ফলাহারও গ্রহণ করেন।
এই দিনে সাধারণত খাওয়া যায় —
ফল
দুধ
সাবুদানা
আলু
চিনাবাদাম
সিংহাড়া আটা
এদিন সাধারণত চাল, গম, ডাল ইত্যাদি শস্য খাওয়া হয় না।
আমলকি একাদশীর আধ্যাত্মিক গুরুত্ব
আমলকী একাদশী কেবল একটি উপবাস নয়, এটি ভগবান শ্রীহরির প্রতি ভক্তি ও সমর্পণের দিন। আশা করি, sukherchabikathi.in-এর এই পোস্টটি আপনার ভালো লেগেছে। ঈশ্বরের কৃপা আপনার ও আপনার পরিবারের উপর সর্বদা বজায় থাকুক।
এই ধরনের আরও আধ্যাত্মিক তথ্য ও ব্রতকথা সহজ বাংলায় পড়তে আমাদের ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং পোস্টটি শেয়ার করে অন্যদেরও জানার সুযোগ করে দিন।
পরিশেষ:
🙏 ভক্তিভরে আমলকি একাদশী ব্রত পালন করলে ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদ লাভ হয় এবং জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQs)
প্র: আমলকী একাদশী কবে পালিত হয়? উ: হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে অত্যন্ত ভক্তিভরে আমলকী একাদশী পালিত হয়।
প্র: আমলকী একাদশীতে কী কী খাওয়া নিষেধ? উ: অন্যান্য একাদশীর মতোই এই দিনে চাল, ডাল, গম, আটা, ময়দা বা যেকোনো ধরনের শস্যদানা এবং আমিষ খাবার খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। ব্রতীরা সাধারণত ফল, দুধ, সাবু বা আলু খেয়ে উপবাস পালন করেন।
প্র: এই একাদশীতে আমলকী গাছের পূজা কেন করা হয়? উ: পুরাণ মতে, আমলকী বা আমলা গাছে স্বয়ং ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণু এবং দেবাদিদেব মহাদেব অবস্থান করেন। তাই এই পবিত্র দিনে আমলকী গাছের পূজা করলে ঈশ্বরের বিশেষ কৃপা লাভ হয় এবং সকল পাপ দূর হয়।
প্র: আমলকী একাদশীর পারণ বা উপবাস ভঙ্গ কীভাবে করতে হয়? উ: একাদশীর পরের দিন, অর্থাৎ দ্বাদশীর সকালে নির্দিষ্ট পারণ সময়ের মধ্যে ভগবান বিষ্ণুকে ভোগ নিবেদন করে এবং ব্রাহ্মণ বা দরিদ্রকে অন্ন ও আমলকী দান করার পর ব্রত ভঙ্গ করতে হয়। পারণের সময় মুখে একটি আমলকী বা তুলসী পাতা দিয়ে উপবাস ভাঙা অত্যন্ত শুভ।










