পুরীর শ্রী জগন্নাথ মন্দির সনাতন হিন্দু ধর্মের অন্যতম পবিত্র এবং রহস্যময় একটি তীর্থস্থান। এই পবিত্র ধামের সাথে যেমন জড়িয়ে আছে অসংখ্য অলৌকিক কাহিনী, তেমনি এর ইতিহাসে রয়েছে কিছু অন্ধকার অধ্যায়ও।
আপনি কি জানেন, ১৬শ শতাব্দীতে কালাপাহাড় নামক এক কুখ্যাত সেনাপতি এই মন্দিরে আক্রমণ চালিয়েছিলেন? তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ভগবান জগন্নাথ দেবের মূর্তি ধ্বংস করা। কিন্তু শত চেষ্টা করেও তিনি জগন্নাথ দেবের মূর্তির ভেতরে থাকা পবিত্র ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ ধ্বংস করতে পারেননি। আজকের এই নিবন্ধে আমরা জানবো কালাপাহাড়ের ইতিহাস এবং কীভাবে এক পরম ভক্ত সেই পবিত্র ব্রহ্ম পদার্থটি রক্ষা করেছিলেন।
কালাপাহাড় কে ছিলেন?
ইতিহাস এবং লোকগাথা ঘাটলে কালাপাহাড়ের জন্ম ও প্রাথমিক জীবন নিয়ে একাধিক মতভেদ পাওয়া যায়। ওড়িশা ও বাংলার প্রচলিত জনশ্রুতি এবং ‘মাদলা পাঁজি’ নামক ইতিহাসগ্রন্থ অনুযায়ী, কালাপাহাড় জন্মসূত্রে ছিলেন এক উচ্চবর্ণের বাঙালি হিন্দু ব্রাহ্মণ। তাঁর আসল নাম ছিল রাজীব লোচন রায় বা কালাচাঁদ রায়।
লোকগাথা অনুযায়ী, বাংলার কররানি বংশের সুলতান সুলাইমান খান কররানির রূপবতী কন্যা তাঁর প্রেমে পড়েন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক চাপে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর নতুন নাম হয় মোহাম্মদ খান ফার্মুলি। তবে, ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তিনি অত্যন্ত অনুতপ্ত হন এবং পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার জন্য পুরীর পুরোহিতদের কাছে প্রায়শ্চিত্তের বিধান চান।
কিন্তু তৎকালীন সমাজ তাঁকে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এই চরম প্রত্যাখ্যানের ফলেই তাঁর মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয় এবং তিনি হিন্দু মন্দিরগুলো ধ্বংস করার প্রতিজ্ঞা করেন। (যদিও মোঘল ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি জন্মসূত্রেই একজন আফগান মুসলিম সেনাপতি ছিলেন।)

১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে ওড়িশা ও পুরীর মন্দিরে আক্রমণ
১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে কালাপাহাড় ওড়িশা আক্রমণ করেন। যুদ্ধে ওড়িশার শেষ স্বাধীন রাজা মুকুন্দ দেব নিহত হন। এরপরই কালাপাহাড় শুরু করেন তাঁর নির্মম ধ্বংসলীলা।
তিনি কোণার্কের সূর্য মন্দির এবং ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ মন্দিরের মতো প্রাচীন স্থাপত্যগুলোতে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। এরপর তাঁর লক্ষ্য হয়ে ওঠে পুরীর শ্রী জগন্নাথ মন্দির। আক্রমণের খবর পেয়ে মন্দিরের পুরোহিতরা চিল্কা হ্রদের কাছে হাতিপাদা নামক একটি জায়গায় মাটির নিচে প্রভুর কাঠের বিগ্রহগুলো লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, কালাপাহাড় গুপ্তচরদের মাধ্যমে সেই খবর পেয়ে যান।
জগন্নাথ দেবের অত্যন্ত রহস্যময় ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ কী?
এই ঘটনার গভীরে যাওয়ার আগে জানা প্রয়োজন, ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ আসলে কী? ভগবান শ্রী জগন্নাথ, প্রভু বলভদ্র এবং মাতা সুভদ্রার মূর্তিগুলি সাধারণ পাথর বা ধাতুর নয়, বরং পবিত্র নিম কাঠ বা ‘দারু’ দিয়ে তৈরি করা হয়।
প্রতি ৮, ১২ বা ১৯ বছর পর পর যখন এই মূর্তিগুলি পরিবর্তন করা হয় (যাকে ‘নবকলেবর’ বলা হয়), তখন পুরনো মূর্তি থেকে একটি অত্যন্ত পবিত্র ও রহস্যময় বস্তু নতুন মূর্তির ভেতরে স্থানান্তরিত করা হয়। একেই বলা হয় ‘ব্রহ্ম পদার্থ’।
সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি হলো স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র পিণ্ড বা হৃদপিণ্ড। মহাভারতের যুদ্ধ শেষে শ্রীকৃষ্ণ যখন দেহত্যাগ করেন, তখন তাঁর নশ্বর শরীর দাহ করা হলেও তাঁর হৃদপিণ্ডটি আগুনে পোড়েনি। সেই জ্বলন্ত অংশটিই পরবর্তীতে ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ হিসেবে জগন্নাথ দেবের মূর্তির ভেতরে স্থাপন করা হয়।
কালাপাহাড়ের আগুন ও বিশর মহান্তির দুঃসাহসিক অভিযান
কালাপাহাড় পুরোহিতদের লুকিয়ে রাখা সেই মূর্তিগুলো উদ্ধার করে বাংলার গঙ্গাতীরে নিয়ে আসেন। সেখানে তিনি বিশাল চিতা জ্বালিয়ে মূর্তিগুলিতে আগুন ধরিয়ে দেন। কাঠের মূর্তিগুলি পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও, মূর্তির ভেতরে থাকা পবিত্র ‘ব্রহ্ম পদার্থটি’ অলৌকিকভাবে অক্ষত রয়ে যায়।
ঠিক সেই সময়ে সেখানে ছদ্মবেশে উপস্থিত ছিলেন বিশর মহান্তি নামক এক পরম জগন্নাথ-ভক্ত। কালাপাহাড় মূর্তি পুড়িয়ে চলে যাওয়ার পর, বিশর মহান্তি নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে সেই জ্বলন্ত চিতার ছাইয়ের স্তূপ থেকে পবিত্র ব্রহ্ম পদার্থটি উদ্ধার করেন।
ধরা পড়ার হাত থেকে বাঁচতে তিনি সেই ব্রহ্ম পদার্থটি একটি ‘মাদল’ (এক ধরণের বাদ্যযন্ত্র)-এর ভেতরে লুকিয়ে ফেলেন। এরপর একজন সাধারণ বাউলের ছদ্মবেশে গান গাইতে গাইতে তিনি নিরাপদে ওড়িশায় ফিরে আসেন।
পুরীর মন্দিরের পুনরুজ্জীবন
বিশর মহান্তি ওড়িশায় ফিরে তৎকালীন রাজা রামচন্দ্র দেবের হাতে সেই পবিত্র ব্রহ্ম পদার্থটি তুলে দেন। রাজা রামচন্দ্র দেব নতুন করে নিম কাঠ কেটে ভগবান জগন্নাথ, প্রভু বলভদ্র ও মাতা সুভদ্রার নতুন বিগ্রহ তৈরি করান। বিশর মহান্তির আনা সেই পবিত্র ব্রহ্ম পদার্থটি অত্যন্ত ভক্তিভরে নতুন মূর্তির ভেতরে পুনঃস্থাপন করা হয়। ফলস্বরূপ, ১৫৭৫-৭৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পুরীর মন্দিরে আবার নিয়মিত পূজা-অর্চনা শুরু হয়।
উপসংহার: সনাতন সংস্কৃতির ইতিহাসে কালাপাহাড় যদি অন্ধকারের এবং ধ্বংসের প্রতীক হন, তবে ভক্ত বিশর মহান্তি হলেন সেই সংস্কৃতিকে রক্ষা করার এক উজ্জ্বল আলোর প্রতীক। চরম ধ্বংসলীলার মাঝেও ভগবানের পবিত্র ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ রক্ষা পাওয়ার এই ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, সত্য এবং ভক্তির শক্তি সর্বদা যেকোনো অশুভ শক্তির চেয়ে বড়ো।
পুরীর শ্রী জগন্নাথ দেবের এই অলৌকিক ইতিহাসটি আপনার কেমন লাগলো, তা অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন এবং ভক্তিভরে লিখবেন ‘জয় জগন্নাথ’।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. জগন্নাথ দেবের ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ আসলে কী?
সনাতন হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ হলো স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র হৃদপিণ্ড বা একটি অলৌকিক বস্তু, যা পবিত্র নবকলেবর প্রথার মাধ্যমে শ্রী জগন্নাথ দেবের পুরনো মূর্তি থেকে নতুন মূর্তিতে স্থানান্তরিত করা হয়।
২. কালাপাহাড় কে ছিলেন?
কালাপাহাড় ছিলেন ১৬শ শতাব্দীর একজন অত্যন্ত পরাক্রমশালী ও নির্মম সামরিক সেনাপতি। ইতিহাস ও লোকগাথা অনুযায়ী, তিনি পুরীর শ্রী জগন্নাথ মন্দির এবং কোণার্কের সূর্য মন্দির সহ বহু হিন্দু মন্দির ও বিগ্রহ ধ্বংস করেছিলেন।
৩. জ্বলন্ত চিতা থেকে কে ব্রহ্ম পদার্থ উদ্ধার করেছিলেন?
কালাপাহাড় ভগবান জগন্নাথ দেবের মূর্তিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর, বিশর মহান্তি নামক একজন পরম জগন্নাথ-ভক্ত নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জ্বলন্ত চিতার ছাই থেকে পবিত্র ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ উদ্ধার করেছিলেন।








