সনাতন ধর্মে মৃত্যুর পর আত্মার যাত্রাপথকে অত্যন্ত রহস্যময় এবং গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। গরুড় পুরাণ অনুসারে, অনেক সময় তীব্র মোহ, অপমৃত্যু বা শ্রাদ্ধকর্মে ত্রুটির কারণে আত্মা এই মর্ত্যলোকেই প্রেতযোনি ধারণ করে আটকে পড়ে।
কিন্তু আপনি কি জানেন, হিন্দু শাস্ত্রে এমন এক পরম পবিত্র ধামের কথা বলা হয়েছে, যেখানে মাত্র একবার পিণ্ডদান করলেই বংশের শত শত বছরের অতৃপ্ত পূর্বপুরুষেরা চিরতরে মুক্তি পেয়ে যান? হ্যাঁ, আমরা কথা বলছি মোক্ষধাম গয়া তীর্থের। আজকের এই নিবন্ধে আমরা জানব গয়া তীর্থে পিণ্ডদান করার অলৌকিক ও শাস্ত্রীয় মাহাত্ম্য।
গয়াসুরের পৌরাণিক কাহিনী: কীভাবে এই ভূমি পবিত্র হলো?
গয়া তীর্থের এই অলৌকিক মাহাত্ম্য বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাচীন পৌরাণিক যুগে। পুরাণে বর্ণিত আছে, ‘গয়াপুর’ বা বর্তমান গয়া শহরের নামকরণ হয়েছিল ‘গয়াসুর’ নামক এক পরম বিষ্ণুভক্ত অসুরের নামানুসারে। বস্তুত, তিনি কঠোর তপস্যা করে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর কাছ থেকে এক অদ্ভুত বর লাভ করেন।
বরটি ছিল— যে কেউ গয়াসুরের পবিত্র শরীর দর্শন বা স্পর্শ করবে, সে তার সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে সরাসরি বৈকুণ্ঠে স্থান পাবে। ফলে সৃষ্টিজগতের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে শুরু করে। তখন দেবরাজ ইন্দ্রের অনুরোধে ভগবান শ্রীবিষ্ণু এক পরম লীলা রচনা করেন।
গয়াসুরের পবিত্র শরীরের ওপর দেবতাদের একটি মহাযজ্ঞের আয়োজন করা হয়। যজ্ঞের শেষে ভগবান শ্রীবিষ্ণু নিজের পবিত্র পা বা ‘বিষ্ণুপদ’ তাঁর বুকের ওপর স্থাপন করেন। এবং তাঁকে বর দেন— “আজ থেকে এই ভূমি মোক্ষধাম গয়া নামে পরিচিত হবে। এখানে যে কেউ ভক্তিভরে গয়া তীর্থে পিণ্ডদান করবে, তাঁর পিতৃপুরুষেরা সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে পরম গতি লাভ করবেন।”

গরুড় পুরাণ অনুযায়ী গয়া শ্রাদ্ধের মাহাত্ম্য
আমাদের সনাতন শাস্ত্র, বিশেষ করে গরুড় পুরাণে গয়া তীর্থের গুরুত্বকে অত্যন্ত উচ্চে স্থান দেওয়া হয়েছে। কেননা, স্বয়ং ভগবান শ্রীহরি পক্ষীরাজ গরুড়কে পিতৃপুরুষদের উদ্ধার সম্পর্কে গভীর জ্ঞান দিয়েছেন।
- নিম্নলোক থেকে মুক্তি: গরুড় পুরাণে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যদি কোনো পূর্বপুরুষের আত্মা নিম্নলোকে আটকে থাকে, তবে গয়াতে শ্রাদ্ধ করলে তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে সেই কষ্ট থেকে উদ্ধার পান।
- শ্রাদ্ধকারীর পরম গতি: শাস্ত্রে বলা হয়েছে, যিনি এই পবিত্র তীর্থে দাঁড়িয়ে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাভরে শ্রাদ্ধ ও তর্পণ সম্পন্ন করেন, তিনি নিজেও পরকালে পরম পবিত্র ব্রহ্মলোক লাভ করেন।
- একুশ কুলের উদ্ধার: সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, গয়াধামে করা একটি পিণ্ডদান কেবল নিজের বাবা-মায়ের আত্মাকেই শান্তি দেয় না। বরং পিতৃকুল, মাতৃকুল এবং শ্বশুরকুলের একুশটি প্রজন্মের অতৃপ্ত আত্মাকে বৈকুণ্ঠে পৌঁছে দেয়।
ফাল্গু নদী, অক্ষয়বট এবং শ্রী বিষ্ণুপদের অলৌকিকত্ব
গয়া তীর্থে পিণ্ডদানের সময় তিনটি প্রধান স্থানের মহিমা সবচেয়ে বেশি। যেমন—
- ১. ফাল্গু নদী: রামায়ণের কাহিনী অনুসারে, মাতা সীতার অভিশাপের কারণে এই নদী ‘অন্তসলিলা’ বা বাইরে থেকে শুষ্ক। কিন্তু বালির নিচে এখনো পবিত্র জলধারা প্রবাহিত হয়। এই নদীর বালুকা মিশ্রিত পিণ্ড পিতৃপুরুষদের তীব্র ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নিবারণ করে।
- ২. শ্রী বিষ্ণুপদ মন্দির: এই পরম পবিত্র স্থানে স্বয়ং ভগবান গদাধর শ্রীবিষ্ণুর পবিত্র চরণের ছাপ রয়েছে। মনে করা হয়, এই বিষ্ণুপদে অর্পিত পিণ্ড সরাসরি ভগবানের শ্রীচরণে পৌঁছায়।
- ৩. পবিত্র অক্ষয়বট: ত্রেতাযুগে মাতা সীতা এই অক্ষয়বট বৃক্ষকে অমরত্বের বর দিয়েছিলেন। বলা হয়, গয়া শ্রাদ্ধের শেষ পিণ্ডটি এই অক্ষয়বটের নিচেই দিতে হয়। এর ফলে পূর্বপুরুষদের তৃপ্তি চিরকালের জন্য অমর হয়ে যায়।
গয়াতে পিণ্ডদান করার নিয়ম ও সঠিক সময়
গয়াতে পিণ্ডদান করার সুনির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় নিয়ম রয়েছে। সাধারণত আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষ বা ‘পিতৃপক্ষ’ হলো গয়া শ্রাদ্ধের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। তবে বছরের যেকোনো অমাবস্যা তিথিতে গয়াতে গিয়ে শ্রাদ্ধ করা অত্যন্ত ফলদায়ক।
এখানে এসে তিল, জল, কুশ ঘাস এবং চাল বা যবের আটা দিয়ে পিণ্ড তৈরি করতে হয়। এরপর পূর্বপুরুষদের নাম ও গোত্র উচ্চারণ করে তা উৎসর্গ করতে হয়। অধিকন্তু, যদি কারো পূর্বপুরুষের নাম জানা না থাকে, তবে তাঁদের উদ্দেশ্যে ‘জ্ঞাত-অজ্ঞাত পিণ্ডদান’ করার শাস্ত্রীয় বিধান রয়েছে।
উপসংহার: সনাতন ধর্মে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই হলো মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম। আমাদের এই সুন্দর জীবনের পেছনে তাঁদের অবদান অপরিসীম। তাই জীবনে অন্তত একবার মোক্ষধাম গয়া তীর্থে গিয়ে নিজের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করা প্রতিটি সন্তানের পরম কর্তব্য। এর ফলে পিতৃঋণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং জীবনে পিতৃপুরুষদের স্বর্গীয় আশীর্বাদ সর্বদা বজায় থাকে।
আশা করি, গয়া তীর্থের এই মহিমান্বিত তথ্য আপনাদের আধ্যাত্মিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে। আপনার মতামত অবশ্যই কমেন্ট করে জানান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. গয়া তীর্থে পিণ্ডদান করার সবচেয়ে ভালো সময় কোনটি?
আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষ বা ‘পিতৃপক্ষ’ (মহালয়ার আগের ১৫ দিন) গয়া তীর্থে পিণ্ডদান করার জন্য সবচেয়ে পবিত্র এবং উপযুক্ত সময়।
২. গয়াসুর কে ছিলেন?
গয়াসুর ছিলেন প্রাচীনকালের এক পরম বিষ্ণুভক্ত অসুর, যাঁর পবিত্র শরীরের ওপর ভগবান শ্রীবিষ্ণু নিজের চরণ স্থাপন করেছিলেন। তাঁর নামানুসারেই এই স্থানের নাম ‘গয়া’ হয়েছে।
৩. ফাল্গু নদী জলহীন কেন?
পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, ত্রেতাযুগে মাতা সীতার অভিশাপের কারণে ফাল্গু নদী বাইরে থেকে শুষ্ক বা জলহীন থাকে, কিন্তু এর বালির নিচ দিয়ে পবিত্র অন্তঃসলিলা ধারা প্রবাহিত হয়।
৪. গয়াতে পিণ্ডদান করলে কী ফল লাভ হয়?
গরুড় পুরাণ অনুযায়ী, গয়াতে পিণ্ডদান করলে পূর্বপুরুষদের অতৃপ্ত আত্মা নরক বা নিম্নলোক থেকে মুক্তি লাভ করে এবং শ্রাদ্ধকারী নিজেও জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি ও পরকালে মোক্ষ লাভ করেন।









