
হিন্দু ধর্মে মা মঙ্গলচণ্ডী হলেন আদ্যাশক্তি চণ্ডীরই এক মঙ্গলদায়ক রূপ। বিশেষ করে জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রতিটি মঙ্গলবার বহু মহিলা পরিবারের সুখ, শান্তি ও মঙ্গল কামনায় এই ব্রত পালন করেন। শাস্ত্র মতে, ভক্তিভরে এই ব্রত পালন করলে সংসারের দুঃখ-কষ্ট দূর হয় এবং জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি আসে।
আজকের এই প্রতিবেদনে জানুন ২০২৬ সালের মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের তারিখ, ব্রত পালনের নিয়ম, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং একটি অত্যন্ত শিক্ষণীয় প্রাচীন ব্রতকথা, যা আজও মানুষের জীবনে গভীর শিক্ষা দেয়।
“সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে…” — মা মঙ্গলচণ্ডীর প্রণাম মন্ত্র
২০২৬ সালে মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের তারিখ
২০২৬ সালে জ্যৈষ্ঠ মাসের মঙ্গলবার অনুযায়ী মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রতের গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলি নিচে দেওয়া হলো —
- 4ঠা জ্যৈষ্ঠ (19শে মে)
- 11ই জ্যৈষ্ঠ (26শে মে)
- 18ই জ্যৈষ্ঠ (2রা জুন)
- 25শে জ্যৈষ্ঠ (9ই জুন)
মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত কবে পালন করা হয়?
শাস্ত্র অনুযায়ী, জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রতিটি মঙ্গলবার মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত পালন করা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে পরিবারের মঙ্গল, সন্তানের সুখ এবং সংসারের শান্তি কামনায় বহু মহিলা এই ব্রত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।
বিশ্বাস করা হয়, ভক্তিভরে এই ব্রত করলে মা মঙ্গলচণ্ডী সংসারের দুঃখ দূর করে সুখ ও সমৃদ্ধির আশীর্বাদ প্রদান করেন।
মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের উপকরণ
এই ব্রত পালনের জন্য কয়েকটি বিশেষ উপকরণের প্রয়োজন হয়। সাধারণত নিচের উপকরণগুলি ব্যবহার করা হয় —
- 17 টি গোটা সুপারি
- ধান ও দুর্বা
- বেলপাতা
- পৈতা
- ঋতুফল হিসেবে পাকা আম ও কাঁঠাল
মঙ্গলচণ্ডী ব্রত পালনের নিয়ম
শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করে মা মঙ্গলচণ্ডীর পূজা করতে হয়। পূজার সময় ভক্তিভরে ব্রতকথা শ্রবণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
পূজার সময় দেবীর ধ্যানমন্ত্র পাঠ করা হয় —
“ওঁ যৈষা ললিতকান্তাখ্যা দেবী মঙ্গলচণ্ডিকা।
বরদাভয়হস্তা চ চন্দ্রা গৌরদেহিকা।
রক্তপদ্মাসনা দেবী মুকুটোজ্জ্বলমণ্ডিতা।
রক্তকৌষেয়বসনা স্মিতবক্ত্রা শুভাননা।
নবযৌবনসম্পন্না চাম্পেয় ললিতপ্রভা॥”
এছাড়াও প্রণাম মন্ত্র হিসেবে পাঠ করা হয় —
“সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণী নমোস্তুতে॥”
মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রতকথা
প্রাচীনকালে এক গ্রামে রত্নাবতী নামে এক পরম ভক্তিমতী ব্রাহ্মণী বাস করতেন। তাঁর প্রিয় সই ছিলেন কামিনী, যিনি জাতিতে ছিলেন নাপতিনী। রত্নাবতী ছিলেন বেশ সচ্ছল, কিন্তু কামিনী ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র। অভাবে অনটনে কামিনীর সংসার চলত না।
একদিন কামিনী কেঁদে কেঁদে রত্নাবতীকে বললেন, “সই, আমার এই দুঃখ কি কোনোদিন ঘুচবে না? আমি আর সইতে পারছি না।”
রত্নাবতী তখন পরম মমতায় বললেন, “ভয় নেই সই, তুই জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রতিটি মঙ্গলবার মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত কর। মা চাইলে তোর সব অভাব দূর হবে।”
সইয়ের কথা শুনে কামিনী ভক্তিভরে ব্রত শুরু করলেন। আশ্চর্য বিষয়! অল্পদিনেই কামিনীর সংসারে শ্রী ফিরল। দারিদ্র্য ঘুচে গিয়ে তিনি প্রচুর ধন-সম্পত্তির মালকিন হয়ে উঠলেন।
পরীক্ষা ও অহংকার
কিন্তু অতিরিক্ত সুখ অনেক সময় মানুষের বিচারবুদ্ধি কেড়ে নেয়। কামিনী ভাবলেন, মা সত্যিই তাঁকে করুণা করছেন নাকি সবটাই কাকতালীয়? তিনি দেবীকে পরীক্ষা করতে চাইলেন।
প্রথমে তিনি পড়শীদের লাউগাছ ছিঁড়ে দিলেন। ভাবলেন অমঙ্গল হবে। কিন্তু দেখা গেল সেই গাছ আরও দ্বিগুণ বেড়ে উঠেছে।
এরপর তিনি ভাগাড়ে গিয়ে রাজার মৃত হাতির সামনে বসে কাঁদতে লাগলেন। মা মঙ্গলচণ্ডীর কৃপায় সেই মৃত হাতি জীবন ফিরে পেল। রাজা খুশি হয়ে কামিনীকে প্রচুর ধনরত্ন উপহার দিলেন।
এতকিছুর পরেও কামিনীর সংশয় দূর হলো না। এবার তিনি বিষের নাড়ু তৈরি করে নিজের মেয়ে-জামাইয়ের বাড়ি পাঠালেন। তিনি ভাবলেন, যদি মা মঙ্গলচণ্ডী সত্য হন, তবে তারা মরবে না।
আশ্চর্যভাবে সেই বিষের নাড়ু অমৃতের মতো মিষ্টি হয়ে গেল এবং মেয়ে-জামাইয়ের কোনো ক্ষতি হলো না।
পতন ও উদ্ধার
এরপর কামিনী অহংকারী হয়ে উঠলেন। তিনি ভাবলেন, ব্রত না করলেও তাঁর সুখ বজায় থাকবে। তিনি ব্রত পালন বন্ধ করে দিলেন।
আর ঠিক তখনই শুরু হলো ভয়াবহ বিপর্যয়। এক অগ্নিকাণ্ডে তাঁর ঘরবাড়ি ভস্মীভূত হলো। একে একে সন্তান ও জামাইয়ের মৃত্যুসংবাদ এল। কামিনী পথে বসে কাঁদতে লাগলেন।
তখন মা মঙ্গলচণ্ডী এক বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর ছদ্মবেশে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন। কামিনী কাঁদতে কাঁদতে নিজের ভুল স্বীকার করলেন।
মা তখন আসল রূপে দেখা দিয়ে বললেন, “অহংকার ত্যাগ করে আবার ভক্তিভরে আমার ব্রত কর, তবেই তোর সব ফিরে পাবি।”
কামিনী পুনরায় নিষ্ঠার সঙ্গে মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত পালন করলেন। দেবীর কৃপায় তাঁর ঘরবাড়ি, জমিজমা সব ফিরে এল এবং মৃত সন্তান ও জামাই জীবন ফিরে পেল।
সেই থেকে এই ব্রত চারিদিকে প্রচারিত হলো এবং আজও বহু মানুষ ভক্তিভরে মা মঙ্গলচণ্ডীর আরাধনা করে থাকেন।
মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের শিক্ষা
মা মঙ্গলচণ্ডীর এই কাহিনী আমাদের শেখায় যে, বিপদের সময় ধৈর্য হারানো যেমন ভুল, তেমনই সুখের সময় অহংকার করাও পতনের কারণ।
ভক্তিভরে মায়ের আরাধনা করলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি থেকেও মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তাই আজও বহু মানুষ বিশ্বাস ও নিষ্ঠার সঙ্গে এই ব্রত পালন করে থাকেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. মঙ্গলচণ্ডী ব্রত কবে পালন করা হয়?
উত্তর: জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রতিটি মঙ্গলবার মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত পালন করা হয়।
২. মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের প্রধান উপকরণ কী কী?
উত্তর: ১৭টি গোটা সুপারি, ধান, দুর্বা, বেলপাতা, পৈতা, আম ও কাঁঠাল এই ব্রতের প্রধান উপকরণ।
৩. মঙ্গলচণ্ডী ব্রত করলে কী ফল পাওয়া যায়?
উত্তর: শাস্ত্র মতে, এই ব্রত করলে সংসারের অশান্তি দূর হয় এবং সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়।
৪. মঙ্গলচণ্ডী ব্রতকথার মূল শিক্ষা কী?
উত্তর: অহংকার ত্যাগ করে ভক্তিভরে দেবীর আরাধনা করাই এই ব্রতকথার প্রধান শিক্ষা।
আরও পড়ুন
আপনি কি মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত পালন করেন? কমেন্ট করে জানান এবং পোস্টটি শেয়ার করুন।










