মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিয়ে কথা বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক মহাপ্রলয়, যেখানে এক পক্ষে ছিলেন ধর্মপরায়ণ পঞ্চপাণ্ডব আর অন্য পক্ষে অধর্মের প্রতীক শত কৌরব। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি, এই যুদ্ধে ধৃতরাষ্ট্রের ১০০ পুত্রই ভীমের গদার আঘাতে বা অর্জুনের তীরের মুখে নিহত হয়েছিলেন। কৌরব বংশের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার মতো কেউ অবশিষ্ট ছিল না।
কিন্তু এই প্রচলিত ধারণার আড়ালে লুকিয়ে আছে মহাভারতের এক উপেক্ষিত অধ্যায়। আপনি কি জানেন, ধৃতরাষ্ট্রের আসলে ১০১ জন পুত্র ছিলেন? এবং তাদের মধ্যে একজন—মাত্র একজন—এই মহাযুদ্ধে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন?
তিনি দুর্যোধন বা দুঃশাসনের মতো ক্ষমতার লোভে অন্ধ হননি। তিনি ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি রক্তের সম্পর্কের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিলেন ধর্মকে। তার নাম যুযুৎসু। আজ আমরা শুনবো মহাভারতের সেই ভুলে যাওয়া বীরের কাহিনী, যিনি কৌরব হয়েও লড়েছিলেন পাণ্ডবদের হয়ে।
যুযুৎসুর জন্ম ও পরিচয়
যুযুৎসুর কাহিনী জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই সময়ে, যখন হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে মহারানী গান্ধারী গর্ভবতী ছিলেন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও যখন তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হচ্ছিল না, তখন রাজা ধৃতরাষ্ট্র বংশরক্ষা নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন।
সেই সময় ধৃতরাষ্ট্রের সেবা-যত্ন করতেন এক বৈশ্যবংশীয় দাসী বা পরিচারিকা (কোনো কোনো বর্ণনায় তার নাম ‘সুঘদা’ পাওয়া যায়)। ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে এবং এই দাসীর গর্ভে এক পুত্রের জন্ম হয়। তার নাম রাখা হয় যুযুৎসু।
কাকতালীয়ভাবে, গান্ধারীর গর্ভ থেকে দুর্যোধন ও দুঃশাসন সহ ১০০ পুত্রের জন্মের প্রক্রিয়া যেই সময়ে শুরু হয়, ঠিক সেই সময়েই যুযুৎসুরও জন্ম হয়। অর্থাৎ, বয়সে তিনি ছিলেন দুর্যোধনদের সমসাময়িক। তিনি রাজরক্ত বহন করছিলেন ঠিকই, কিন্তু মায়ের পরিচয়ের কারণে তাকে কখনোই রাজপুত্রের পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন রাজপ্রাসাদের ছায়ায়, কৌরবদের একজন হয়েও যেন পুরোপুরি তাদের একজন ছিলেন না।
ধর্মের সংকট ও মতভেদ
যুযুৎসু অস্ত্রশিক্ষা লাভ করেছিলেন দ্রোনাচার্যের কাছে এবং তিনি ছিলেন একজন ‘অতিরথী’ যোদ্ধা। কিন্তু মানসিকতায় তিনি ছিলেন তার সৎ ভাইদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
ছোটবেলা থেকেই দুর্যোধন এবং শকুনি যখন পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে একের পর এক জঘন্য ষড়যন্ত্র করত—কখনও ভীমকে বিষ খাওয়ানো, কখনও জতুগৃহে আগুন দেওয়া—যুযুৎসু কখনোই তাতে সায় দিতেন না। তার বিবেক তাকে বাধা দিত। তিনি মনেপ্রাণে জানতেন, তার ভাইয়েরা যা করছে তা ঘোর অধর্ম।
মহাভারতে দেখা যায়, দুর্যোধনের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করতেন মূলত দুজন কৌরব—বিকর্ণ এবং যুযুৎসু। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিকর্ণ ভ্রাতৃঋণের কাছে নতি স্বীকার করে কৌরবদের হয়েই যুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু যুযুৎসু ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। তার কাছে পরিবারের চেয়েও ধর্মের ডাক ছিল বড়।
মহাযুদ্ধের আগে এক চরম সিদ্ধান্ত
অবশেষে ঘনিয়ে এল কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ। কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে দুই পক্ষ মুখোমুখি। শঙ্খধ্বনি বেজে উঠেছে। ঠিক সেই চরম মুহূর্তে, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এক অভাবনীয় পদক্ষেপ নিলেন। তিনি কৌরব সেনার উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে ঘোষণা করলেন:
“যদি তোমাদের মধ্যে এমন কেউ থাকো যে মনে করো আমরা ধর্মের পথে আছি, এবং এই অধর্মের সঙ্গ ত্যাগ করতে চাও, তবে এখনই আমাদের পক্ষে চলে এসো। আমি তাকে সাদরে গ্রহণ করবো।”
পুরো রণক্ষেত্র স্তব্ধ হয়ে গেল। দুর্যোধন উপহাসের হাসি হাসলেন। কিন্তু ঠিক তখনই কৌরব ব্যূহ ভেদ করে একটি রথ এগিয়ে এল। সবাই বিস্ময়ে দেখল, রথে বসে আছেন স্বয়ং ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র—যুযুৎসু।
তিনি সোজা যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে বললেন, “আমি জানি আমার ভাইয়েরা অধর্মের পথে আছে। আমি অন্ধ পিতার পুত্র হতে পারি, কিন্তু আমার বিবেক অন্ধ নয়। আমি ধর্মের পক্ষে যুদ্ধ করতে চাই।”
যুধিষ্ঠির তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। দুর্যোধন তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে গালি দিলেন, কিন্তু যুযুৎসু জানতেন তিনি সঠিক পথই বেছে নিয়েছেন। ১৮ দিনের যুদ্ধে তিনি পাণ্ডবদের হয়ে বীরত্বের সাথে লড়াই করেছিলেন—নিজের ভাইদের বিরুদ্ধেই।
একমাত্র বেঁচে থাকা কৌরব
১৮ দিন পর যুদ্ধ শেষ হলো। কুরুক্ষেত্রের মাটি রক্তে রঞ্জিত হলো। গান্ধারীর ১০০ পুত্রই নিহত হলেন। কিন্তু একজন বেঁচে রইলেন। তিনি যুযুৎসু। যেহেতু তিনি ধর্মের পক্ষ নিয়েছিলেন, তাই পাণ্ডবরা তাকে রক্ষা করেছিলেন।
যুদ্ধের পর তার জীবন সহজ ছিল না। একদিকে তিনি ছিলেন পাণ্ডবদের সম্মানিত মিত্র, অন্যদিকে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর কাছে তিনি ছিলেন তাদের পুত্রহन्তাদের সঙ্গী। এই মানসিক দ্বন্দ্ব নিয়েই তিনি বাকি জীবন কাটিয়েছেন।
কিন্তু তার গল্পের সবচেয়ে বড় মোড় আসে যুদ্ধের অনেক পরে। যখন পাণ্ডবরা মহাপ্রস্থানের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তারা অর্জুনের পৌত্র, বালক পরীক্ষিৎ-কে রাজা ঘোষণা করলেন। আর এই নাবালক রাজার অভিভাবক ও রাজ্য পরিচালনার গুরুদায়িত্ব যার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, তিনি ছিলেন এই যুযুৎসু।
উপসংহার
যাকে একদিন কৌরবরা ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেছিল, শেষ পর্যন্ত তিনিই কুরু বংশের রক্ষাকর্তা হয়েছিলেন। যুযুৎসুর জীবন আমাদের শেখায় যে জন্ম বা বংশপরিচয় মানুষের আসল পরিচয় নয়, আসল পরিচয় তার কর্মে। পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, নিজের পরিবারও যদি ভুল পথে থাকে, তবুও সত্য ও ধর্মের পথ বেছে নেওয়াই প্রকৃত বীরের লক্ষণ। মহাভারতের ইতিহাসে যুযুৎসু তাই এক চিরকালীন অনুপ্রেরণা।