বসন্তের বাতাস বইছে, আর গাছে গাছে পলাশ ফুল ফুটেছে মানেই বাঙালির মনে একটাই সুর—সরস্বতী পূজা। ছোটবেলার সেই হলুদ শাড়ি বা পাঞ্জাবি পরা, আর পড়ার বই মায়ের পায়ের কাছে রেখে একটু নিশ্চিন্ত হওয়া—এই অনুভূতি বাঙালি ছাড়া আর কে বুঝবে!
আপনি কি এ বছর বাড়িতেই মা সরস্বতীর আরাধনা করার কথা ভাবছেন? পুরোহিত পাওয়া যাচ্ছে না বা নিজের হাতেই ভক্তিভরে মাকে ডাকতে চান? চিন্তা নেই! আজকের এই ব্লগে আমরা জানব, খুব সহজে এবং সঠিক নিয়ম মেনে কীভাবে ঘরেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করবেন।
১. পূজার পূর্ব-প্রস্তুতি (Preparation)
সরস্বতী পূজা মানেই শুদ্ধতা। পূজার আগের দিন থেকেই কিছু প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন:
ঘর পরিষ্কার: ঠাকুর ঘর বা যেখানে পূজা করবেন, সেই জায়গাটি খুব ভালো করে পরিষ্কার করে গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিন।
আলপনা: পূজার জায়গায় চালের গুঁড়ো বা খড়িমাটি দিয়ে সুন্দর আলপনা দিন। এটি শুভ বা মঙ্গলের প্রতীক।
মূর্তি বা ছবি স্থাপন: একটি চৌকি বা বেদীর ওপর হলুদ বা সাদা কাপড় পেতে মায়ের মূর্তি বা ছবি স্থাপন করুন।
২. পূজার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ (Essential Items)
খুব বেশি আড়ম্বরের প্রয়োজন নেই, ভক্তিই আসল। তবে যা যা হাতের কাছে রাখা দরকার:
মায়ের সাজ: পলাশ ফুল (অত্যাবশ্যক), গাঁদা ফুলের মালা, বেলপাতা, আমলকী।
নৈবেদ্য: ফলমূল (শাঁকালু, টোপাকুল আবশ্যিক), মিষ্টি, বাতাসা, নাড়ু।
অন্যান্য: দোয়াত-কলম, বই-খাতা, বাদ্যযন্ত্র (যদি থাকে), কাঁচা হলুদ, ধূপ, দীপ, এবং অবশ্যই অভ্র।
৩. ঘরোয়া সরস্বতী পূজার বিধি ও নিয়ম (Step-by-Step Method)
বাড়িতে পুরোহিত না থাকলে আপনি নিজেও ভক্তিভরে এই নিয়মগুলি পালন করতে পারেন:
সঙ্কল্প ও ঘট স্থাপন সকালবেলা স্নান করে শুদ্ধ হলুদ বা বাসন্তী রঙের বস্ত্র পরিধান করুন। এরপর পূজার স্থানে একটি মাটির বা পিতলের ঘটে জল ভরে, তার মুখে আম্রপল্লব ও একটি সশীষ ডাব বা হরিতকি দিয়ে ঘট স্থাপন করুন। মনে মনে মায়ের কাছে সঙ্কল্প করুন যে আপনি ভক্তিভরে পূজাটি সম্পন্ন করবেন।
বই ও কলম অর্পণ: সরস্বতী পূজা মানেই বিদ্যার আরাধনা। বাড়ির বাচ্চাদের পাঠ্যবই, খাতা এবং পেন বা পেন্সিল মায়ের চরণে অর্পণ করুন। দোয়াত ও কালির পূজা করাও বাঙালির বহু পুরনো ঐতিহ্য।
পুষ্পাঞ্জলি: পূজার প্রধান অংশ হলো পুষ্পাঞ্জলি। হাতে ফুল ও বেলপাতা নিয়ে তিনবার মায়ের মন্ত্র উচ্চারণ করে চরণে নিবেদন করুন। মন্ত্র জানা না থাকলে ভক্তিভরে বাংলায় প্রার্থনা করুন:“হে বিদ্যাদেবী সরস্বতী, আমাকে জ্ঞান দাও, বুদ্ধি দাও, আমার অজ্ঞানতা দূর করো।”
হাতেখড়ি: বাড়িতে যদি খুব ছোট শিশু থাকে, তবে সরস্বতী পূজার দিনটি তাদের ‘হাতেখড়ি’ বা স্লেট-পেন্সিল ধরার জন্য অত্যন্ত শুভ। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ শিশুর হাত ধরে স্লেটে ‘অ’ লেখান।
৪. কী করবেন আর কী করবেন না? (Do's and Don'ts)
সরস্বতী পূজায় কিছু বিশেষ নিয়ম বা সংস্কার বাঙালিরা মেনে চলে:
- কুল না খাওয়া: পূজার আগে বা অঞ্জলি না দেওয়া পর্যন্ত কুল (বিশেষত টোপাকুল) খাওয়া নিষিদ্ধ। কথিত আছে, এতে মা সরস্বতী রুষ্ট হন।
- পড়াশোনা বন্ধ: এই দিনটিতে বই-খাতা স্পর্শ করা বা পড়াশোনা করা বারণ। এদিন শুধুই আনন্দের।
- নিরামিষ আহার: পূজার দিন বাড়িতে সম্পূর্ণ নিরামিষ রান্না (যেমন—খিচুড়ি, লাবড়া, চাটনি, পায়েস) খাওয়া উচিত।
৫. উপসংহার (Conclusion)
সরস্বতী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাড়িতে নিজের হাতে পূজা করার আনন্দই আলাদা। মায়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন সকলের ঘরে জ্ঞানের আলো এবং শান্তি বজায় রাখেন।
আপনার বাড়িতে এবারের সরস্বতী পূজা কেমন কাটল? কমেন্ট করে আমাদের জানাতে ভুলবেন না! আর এই ব্লগটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।
FAQs
১. সরস্বতী পূজার দিন কি উপবাস থাকা বাধ্যতামূলক? উঃ সাধারণত অঞ্জলি দেওয়া পর্যন্ত উপবাস থাকা নিয়ম। তবে অসুস্থ বা বয়স্করা হালকা শরবত বা ফল খেতে পারেন।
২. বাড়িতে সরস্বতী পূজায় কি পুরোহিত লাগেই? উঃ না, পুরোহিত না থাকলে আপনি ভক্তিভরে বই বা পঞ্চপঞ্জিকা দেখে মন্ত্র পাঠ করে এবং সঠিক নিয়ম মেনে নিজেই পূজা করতে পারেন।
৩. সরস্বতী পূজার দিন কেন পড়াশোনা করতে নেই? উঃ বিশ্বাস করা হয় যে, এদিন বই-খাতা দেবীর কাছে সমর্পণ করা হয়, তাই তাকে সম্মান জানাতে এদিন পড়াশোনা থেকে বিরতি নেওয়া হয়।